খুলনা | শুক্রবার | ১৫ মে ২০২৬ | ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সুন্দরবনে করিম শরীফ বাহিনীর ৩ সদস্য আটক, অস্ত্র ও গুলিসহ উদ্ধার ৪ জিম্মি জেলে

মোংলা প্রতিনিধি |
০৫:৫১ পি.এম | ১৫ মে ২০২৬


বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বুক থেকে জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে আরও একটি বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করলো বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের শ্যালা নদীর মরা চানমিয়া খালী খাল সংলগ্ন দুর্গম এলাকায় কোস্ট গার্ডের সাথে কুখ্যাত বনদস্যু ‘করিম শরীফ বাহিনী’র মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর কোস্ট গার্ড বাহিনী ৩ জন সক্রিয় বনদস্যুকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে দস্যুদের জিম্মি দশা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪ জন জেলেকে এবং জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, তাজা বুলেট ও ওয়াকিটকি সেট সহ অন্যান্য মালামাল। আজ শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাঁড়াশি অভিযান কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দফতর সূত্রে জানায়, ১৩ মে বুধবার রাতে কোস্ট গার্ডের একটি বিশেষ দল নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে সুন্দরবনের শ্যালা নদী এলাকায় অবস্থান করছিল। গভীর রাতে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর আসে, বনের মরা চানমিয়া খালী খালের গভীর অরণ্যের ভেতরে করিম শরীফ বাহিনীর একদল সশস্ত্র দস্যু অবস্থান নিয়েছে। তারা সেখানে জড়ো হয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে আসা জেলেদের ওপর বড় ধরনের ডাকাতি এবং মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণের ছক কষছিল। এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ডের বিশেষ কমান্ডো দল কালক্ষেপণ না করে দ্রæত ইঞ্জিনচালিত বোট নিয়ে ওই খালের মুখে অবস্থান নেয় এবং অত্যান্ত সতর্কতার সাথে বনের ভেতরে অগ্রসর হতে থাকে।

অভিযান পরিচালনাকারী কোস্ট গার্ডের সদস্যরা যখন মরা চানমিয়া খালী খালের গভীর অরণ্যের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন জঙ্গল ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বনদস্যুরা কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকস্মিকভাবে দস্যুরা কোস্ট গার্ডের বোট ও জোয়ানদের লক্ষ্য করে চারদিক থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। এতে বনের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং নিজেদের আত্মরক্ষার্থে কোস্ট গার্ডের সদস্যরাও তৎক্ষণাৎ পজিশন নিয়ে পাল্টা গুলি চালানো শুরু করে। গভীর রাতের অন্ধকারে সুন্দরবনের গহীনে উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তীব্র ও ত্রিমুখী বন্দুকযুদ্ধ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলে এই গোলাগুলি। কোস্ট গার্ডের রণকৌশল, নিখুঁত নিশানা এবং সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে একপর্যায়ে টিকতে না পেরে বনদস্যুরা বনের আরও গভীরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং পিছু হটে।

বনের শ্বাসমূল (নিউমেটোফোর) এবং কাঁদা মাটির দুর্গম পথ পেরিয়ে ধাওয়া করে করিম শরীফ বাহিনীর ৩ জন সক্রিয় সদস্যকে জাপটে ধরে আটক করা হয়। বাকি দস্যুরা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে গহীন জঙ্গলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আটককৃতরা হচ্ছে-মোঃ মেহেদী হাসান (২৫), মোঃ রমজান শরীফ (১৯) ও মোঃ এনায়েত মিয়া (২৫)। আটককৃতদের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ ও ভাঙ্গার ফরিদপরে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে ডাকাতি এবং জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় কতরতো।

বন্দুকযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই কোস্ট গার্ডের দল বন বিভাগের সহায়তায় বনদস্যুদের আস্তানা ও আশেপাশের কর্দমাক্ত এলাকায় একটি ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালায়। ঘটনাস্থলে তল্লাশি করে ৩টি আধুনিক একনলা বন্দুক, ১টি সচল পিস্তল, ৪৯ রাউন্ড তাজা বন্দুকের গুলি, ১৮৭ রাউন্ড এয়ারগানের গোলা (ছররা গুলি), ২টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াকিটকি সেট (যা তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করত) ও ৪টি ওয়াকিটকি চার্জার উদ্ধার করা হয়। এ সময় স্থানীয় বন বিভাগের একটি দলও কোস্ট গার্ডের সাথে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়। যৌথ তল্লাশির একপর্যায়ে বনের ভেতর হাত-পা বাঁধা এবং দস্যুদের কঠোর পাহারায় থাকা ৪ জন সাধারণ জেলেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই জেলেদের সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল থেকে কয়েকদিন আগে করিম শরীফ বাহিনী অপহরণ করেছিল এবং তাদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

আইনি প্রক্রিয়া ও অভিযান অব্যাহত রাখতে কাস্ট গার্ডের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ইকরা মোহাম্মদ নাসিফ জানিয়েছেন, আটককৃত ৩ বনদস্যুদের বিরুদ্ধে সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশ, সরকারি কাজে বাধা, কোস্ট গার্ডের ওপর গুলিবর্ষণ, অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং ডাকাতির উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, ওয়াকিটকিসহ আটককৃত দস্যুদের সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রæততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হবে। সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করতে এবং জেলে, বাউয়ালী ও মৌয়ালীদের নির্ভয়ে জীবিকা অর্জনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের এই বিশেষ যৌথ চিরুনি অভিযান সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ