খুলনা | শনিবার | ১৬ মে ২০২৬ | ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নারী উদ্যোক্তা : স্বাচ্ছন্দ্যের গন্ডি পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে

জয়া মাহবুব |
১২:০২ এ.এম | ১৬ মে ২০২৬


বর্তমান সময়ে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে তাদের মানসিক চাপ, সামাজিক বাধা এবং নিজের ভেতরের দ্বিধা। অনেক নারী স্বপ্ন দেখেন নিজের পরিচয় তৈরি করার, নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর এবং আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার। কিন্তু সেই যাত্রার সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় বাইরের মানুষ নয় বরং নিজের তৈরি করা “কমফোর্ট জোন”।
কমফোর্ট জোন এমন একটি জায়গা যেখানে আমরা নিরাপদ অনুভব করি। এখানে ঝুঁকি কম, সমালোচনার ভয় কম এবং ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কম মনে হয়। একজন নারী উদ্যোক্তার জন্য এই জায়গাটি অনেক সময় খুব আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ সমাজ এখনও নারীদের ভুল করার সুযোগ খুব সহজে দেয় না। একজন পুরুষের ব্যর্থতাকে “অভিজ্ঞতা” বলা হলেও, একজন নারীর ব্যর্থতাকে অনেক সময় “অযোগ্যতা” হিসেবে দেখা হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেক নারী নিজেদের সীমার মধ্যে আটকে রাখেন।
কিন্তু সমস্যাটা এখানেই। নিরাপদ অবস্থানে দীর্ঘদিন থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের সম্ভাবনাকে ছোট করে ফেলতে শুরু করে। একই কাজ, একই চিন্তা এবং একই পরিবেশ মানুষকে স্থির করে দেয়। বাইরে থেকে হয়তো সবকিছু শান্ত মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আত্মবিশ্বাস কমতে থাকে। কারণ মানুষ জানে, সে আরও কিছু করতে পারতো, কিন্তু সাহস করেনি।
এখানেই আসে “গ্রোথ মাইন্ডসেট” বা বিকাশমুখী মানসিকতার বিষয়টি। গ্রোথ মাইন্ডসেট এমন একটি চিন্তাধারা যেখানে মানুষ বিশ্বাস করে যে দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সাফল্য, সবকিছুই চর্চা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তৈরি করা যায়। এটি এমন একটি মানসিকতা যা মানুষকে ভুল করতে শেখায়, আবার সেই ভুল থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিও দেয়।
একজন নারী উদ্যোক্তার জীবনে গ্রোথ মাইন্ডসেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উদ্যোক্তা হওয়া মানেই প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। কখনও ব্যবসায় ক্ষতি হবে, কখনও মানুষের সমালোচনা শুনতে হবে, কখনও কাছের মানুষও সমর্থন দেবে না। কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতিগুলোই একজন উদ্যোক্তাকে পরিণত করে। যিনি প্রতিটি ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যান।
অনেক নারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেন তারা মনে করেন “আমি পুরোপুরি প্রস্তুত হলে শুরু করবো।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেউই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে শুরু করে না। আত্মবিশ্বাস অনেক সময় কাজ শুরু করার পর তৈরি হয়, আগে নয়। ছোট ছোট পদক্ষেপ থেকেই বড় পরিবর্তন শুরু হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমাজের বিচার। আমাদের সমাজে এখনও নারী উদ্যোক্তাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। “এত কিছু করার দরকার কী?”, “সংসার সামলালেই তো হয়”, “ব্যবসা কি নারীদের জন্য সহজ?” এই ধরনের মন্তব্য অনেক নারীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু একজন নারী যদি নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার থাকেন, তাহলে ধীরে ধীরে এই শব্দগুলো তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ তিনি জানেন, নিজের উন্নতির জন্য কখনও কখনও অন্যদের সীমিত চিন্তার বাইরে যেতে হয়।
গ্রোথ মাইন্ডসেটের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এটি মানুষকে নিজের ভেতরের শক্তি চিনতে শেখায়। এটি বলে, “তুমি এখন যা, ভবিষ্যতে তার চেয়েও ভালো হতে পারো।” একজন নারী যখন নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্থায়ী মনে না করে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখেন, তখন তার ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং নেতৃত্বের ক্ষমতা, সবকিছু বদলাতে শুরু করে।
তবে গ্রোথ মাইন্ডসেট মানে শুধু বড় বড় স্বপ্ন দেখা নয়। এর মানে হলো নিয়মিত নিজের ভয়কে চ্যালেঞ্জ করা। হয়তো প্রথম লাইভ ভিডিও করতে ভয় লাগছে, প্রথম ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে, অথবা নিজের কাজ প্রকাশ করতে সংকোচ হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবার সেই অস্বস্তির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই একজন মানুষকে আরও শক্তিশালী করে।
একজন নারী উদ্যোক্তার যাত্রা কখনও সহজ নয়। কিন্তু এটি অসম্ভবও নয়। প্রতিটি সফল নারী একসময় অনিশ্চয়তা, ভয় এবং আত্মসন্দেহের মধ্য দিয়েই পথ শুরু করেছিলেন। পার্থক্য শুধু এই যে তারা থেমে যাননি।
সবশেষে বলা যায়, কমফোর্ট জোন আমাদের শান্তি দিতে পারে, কিন্তু গ্রোথ আমাদের নতুন পরিচয় দেয়। নিরাপদ জায়গায় থেকে হয়তো জীবন কাটানো যায়, কিন্তু নিজের প্রকৃত সম্ভাবনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই প্রতিটি নারী উদ্যোক্তার উচিত নিজের ভেতরের ভয়কে স্বীকার করে, ধীরে ধীরে হলেও সামনে এগিয়ে যাওয়া।
কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো সব সময় শুরু হয়, কমফোর্ট জোনের ঠিক বাইরে থেকে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ২১ দিন আগে