খুলনা | রবিবার | ১৭ মে ২০২৬ | ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

‘শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সকলকে দেশ গঠনে হাত দিতে হবে’

১৭ বছরে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দেওয়া হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

খবর প্রতিবেদন |
০১:২৯ এ.এম | ১৭ মে ২০২৬


বিগত ১৭ বছরে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এখন জনগণের শাসন, কথা বলা এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে দেশকে গড়ে তোলা। রাষ্ট্রকে পুনঃগঠন করতে হবে। আমরা দেখেছি বিগণ ১৭ বছর এদেশের মানুষের লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছিল এবং সম্পদ পাচার করে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দেওয়া হয়েছে।
জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের সকলকে দেশ গঠনে হাত দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান । 
শনিবার বিকেলে চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের ঘোষেরহাট এলাকায় বিশ্বখাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই এলাকার সাতটা তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। সাতটা তাজা প্রাণ। কেন ঝরে গিয়েছিল? সেই সাতটা তাজা প্রাণ তাদের দাবি ছিল বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। বিএনপি’রই সাতটা প্রাণ ঝরে গিয়েছে বিগণ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। এইভাবে সারা বাংলাদেশে শুধু বিএনপিরই শত শত নেতাকর্মী তাদের জীবন আত্মাহুতি দিয়েছেন। শুধু জুলাই-আগস্ট মাসেই আমাদের সারা বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চারশোর মতো নেতাকর্মী সেদিন খুন হয়েছিল।
শহীদদের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, তাদের স্বপ্ন যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাদের মৃত্যুকে যদি মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে আমাদের সকলকে আজ দেশ গঠন বা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে আমাদেরকে হাত দিতে হবে।
‘খোদ খাল’ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪৮ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করে গিয়েছিলেন, তারপরে সময়ের পরিক্রমায় খালটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই খাল শহীদ জিয়া যখন খনন করেছিলেন, তার ফলে এই এলাকার কৃষক ভাইদের সুবিধা হয়েছিল। প্রায় ২০০০ কৃষক পরিবারের সুবিধা পেয়েছে। ১৩ কিলোমিটার লম্বা খালের সুবিধা বহু মানুষ পাবে, শুধু কৃষক ভাইয়েরা না, খালের দুই পাশে যারা থাকে তারাও পানির সুবিধা পাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বাংলাদেশের মাটি এত উর্বর করে দিয়েছেন যে আমরা যদি সময়মতন পানি দিতে পারি তাহলে আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে এখানে ফসল পড়ে।
তারেক রহমান বলেন, আন্দোলন সংগ্রাম করে এবং অনেক জীবনের বিনিময়ে দেশের মানুষের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে। আমরা গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম। আর বাংলাদেশের জনগণ সেই আন্দোলনে সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা বিগত সরকারের সময়ে দেখেছি দেশের প্রশাসনকে রাজনীতিকরণ করে তাদের দক্ষতা নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। অন্য দেশের চিকিৎসা সেবার সুবিধার জন্য দেশের চিকিৎসা সেবা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। উন্নয়নের নামে দেশের মানুষের অর্থ লুট করা হয়েছে। গ্রামে উন্নয়ন হয়নি এবং শহরে গিয়ে দেখবেন কতগুলো ফ্লাইওভার হয়েছে, কিন্তু রাস্তাঘাট ভাঙা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যারা কাজ করবে তাদের জন্য বালিশ কেনা হয়েছিল ৮০ হাজার টাকা দিয়ে। একটি বালিশের দাম কখনো আশি হাজার টাকা হতে পারে? জনগণের এ টাকাই বিদেশে পাচার করা হয়েছিল।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য বক্তব্যে বলেছেন এখানে টেকনিক্যাল কলেজ করার জন্য। যদি উন্নয়নই হয়ে থাকে তাহলে কেন গত একযুগে টেকনিক্যাল কলেজ হলো না। এখানে টেকনিক্যাল কলেজ হলে এ এলাকার যুবকরা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবে। তারা প্রশিক্ষণ নিলে দেশ এবং বিদেশে কর্মসংস্থান হবে। 
তিনি বলেন, আজকে আমরা যেই বিশ্বখাল পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু করেছি। এটি বিগণ এক যুগের অধিক সময় কেন সংস্কার হলো না। এটি খনন হলে এ এলাকার মানুষ ও কৃষকরা উপকৃত হবে, কারণ গ্রামে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ বসবাস করে। 
প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে বলেন, আমরা তরুণ-যুবকদের প্রশিক্ষিত এবং মেয়েদের শিক্ষিত করতে উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি মায়েদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করেছি। নির্বাচনের প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী আমরা ধীরে ধীরে প্রত্যেকটি পরিবারের ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব। পাশাপাশি সার-বীজ ক্রয় করার জন্য কৃষক ভাইদের হাতে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। 
কৃষক কার্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রতিবছর যাতে কৃষক ভাইদের যে সার, কীটনাশক, যেসব বীজ, ফসলের বীজ এগুলো কিনতে যেই টাকাটির প্রয়োজন তার একটি অংশ আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ভাইদের হাতে পৌঁছে দেব। 
নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সেই কর্মসূচিকে আমরা আরও এগিয়ে নিয়ে যাব এবং ইনশাআল্লাহ আমরা এই যে মেয়েদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি আছে, এটাকে আমরা ডিগ্রি বা স্নাতক পর্যন্ত আমরা ইনশাআল্লাহ ফ্রি করব। শুধু তাই নয়, যে সকল মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে ইনশাআল্লাহ তাদেরকে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব।
নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী। আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়তে চাই, তাহলে এই নারীদেরকে যদি আমরা স্বাবলম্বী না করি, শিক্ষিত না করি, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না করি তাহলে আমাদের এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।
বেকারত্ব নিরসনে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা চাই আমাদের দেশের তরুণদেরকে টেকনিক্যাল ট্রেনিং দিতে, যাতে করে তারা দেশে কোন একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে অথবা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য তৈরি করতে পারে। যাতে করে দরকার হলে তারা বিদেশেও যেতে পারে এবং বিদেশে যাতে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এখন যে রকম অদক্ষ শ্রমিক যায়, আমরা চাই আমাদের শ্রমিকদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে যাতে বিদেশে গিয়ে তারা বেশি ইনকাম করতে পারে, যাতে করে তারা বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাতে পারে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্যের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চ থেকেই শিক্ষামন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই এলাকার সন্তান চাঁদপুরের সন্তানই হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী। আপনাদের সামনে শিক্ষামন্ত্রীকে আমি এখনই বলে যাচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব সেই টেকনিক্যাল কলেজের ব্যাপারে যাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।জনগণকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত। এই ৪০ কোটি হাত যদি নেমে আসে, এই ৪০ কোটি হাত যদি একসাথে কাজ করা ধরে, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশকে আমরা পৃথিবীর বুকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে সক্ষম হবো।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি’র শক্তির উৎস বাংলাদেশের জনগণ। আমরা যারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল করি, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমরা দল করেছি, আমরা সকলে বলি -জনগণই হচ্ছে আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। ‘করব কাজ, সবার আগে’ স্লোগান তুলে উপস্থিত জনতাকে দেশ গড়ার শপথ নিতে আহŸান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। সমাবেশে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি এবং প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হক দুলু, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডাঃ এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, শরীয়তপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন অপু, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের চেয়ারমান আশিক চৌধুরীসহ জেলা বিএনপি’র বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পরে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী সরকারি কলেজ মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ল্যাপটপের বাটন টিপে ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন ও বিতরণ করেন। এরপর সন্ধ্যায় তিনি চাঁদপুর ক্লাবে জেলা বিএনপি আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় যোগ দেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ