খুলনা | সোমবার | ১৮ মে ২০২৬ | ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সীমানা পিলার লুটের সত্যতা নিশ্চিত করেন কেসিসির প্রশাসক

নদী-খাল থেকে কেসিসির হাজার হাজার সীমানা পিলার উধাও!

শামিম আশরাফ শেলী |
০১:৪২ এ.এম | ১৮ মে ২০২৬


ভূমি দস্যুদের অবৈধ দখলের হাত থেকে কেসিসির সম্পত্তির রক্ষা কবজ ২৯টি নদী ও খালে স্থাপিত লক্ষ লক্ষ টাকার হাজার হাজার সীমানা পিলার লুট হয়ে গেছে। সীমানা চিহ্নের অজুহাতে হয়নি সঠিক নিয়মে ও পরিমাণে নদী-খাল খনন, হয়নি ওয়াক ওয়ে, হয়নি সুদৃশ্য বেঞ্চ স্থাপন, লাগানো হয়নি বক্ষ, চলছে না প্যাডেল বোট পানসি নৌকা, গড়ে ওঠেনি পর্যটন কেন্দ্র, লুট হয়ে গেছে খুলনাবাসীর আন্দোলনের ফসল, তার স্বপ্ন! তবে কেসিসি’র সম্পত্তি শাখার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন সিমানা পিলার চুরির বিষয়ে কিছুই অবগত নন তারা!  
তবে সীমানা পিলার লুট হয়েছে বলে সত্যতা নিশ্চিত করেন কেসিসি’র প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ভূমিদস্যুরা দখলে থাকা উদ্ধারে শিগগিরই উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান প্রশাসক।  
উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল সময়কালের মধ্যে এ সীমানা পিলারগুলি চুরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪-১৫ সালে নগরবাসী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুললে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নগরবাসীর সাথে একাত্মতা পোষণ করে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে। তারই ধারাবাহিকতায়  সর্বপ্রথম ময়ূর নদ ও খুলনা মহানগর সংলগ্ন খালগুলিকে ভূমি দস্যুদের অবৈধ দখল থেকে মুক্ত করতে জেলা প্রশাসনের সাথে যৌথ উদ্যোগে ভূমি দস্যুদের উচ্ছেদ করে নদী-খালগুলির সীমানা চিহ্নিত করতে কয়েক হাজার সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়। এ কাজে কেসিসি’র সম্পত্তি শাখাকে সহয়তা প্রদান করে পূর্ত বিভাগ।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন, খুলনা জেলা প্রশাসন ও বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের যৌথ উদ্যোগ হাজার হাজার সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়, প্রায় অর্ধ কোটি টাকার প্রকল্প ছিলো এটি, তবে কেসিসি’র পূর্ত ও সম্পত্তি শাখা প্রকৃত খরচের হিসাবটি নিশ্চিত করতে পারেনি।
কেসিসি’র সূত্রমতে, ময়ূর নদ, ক্ষুদে নদী, লবনচরা গোড়ার খাল, লবনচরা স্লুইসগেট খাল, লবনচরা ক্ষেত্রখালী খাল, মতিয়াখালী খাল, টুটপাড়া মহিরবাড়ি খাল, বাগমারা ছড়ির খাল, ধোনাই আলী খাল, নিরালা খাল, বানরগাতী মন্দার খাল, ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন খাল, হাজি তমিজুদ্দিন খাল, রায়েরমহল আন্দির খাল, রায়েরমহল মোল্লাপাড়া খাল, খুলনা বিশ^বিদ্যালয় সংলগ্ন মজুমদারের খালসহ ২৯টি খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিলো একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং কেসিসি’র সম্পত্তি রক্ষার আইন সঙ্গত সীমানা চিহ্ন নিশ্চিত করা।      
তৎকালীন মেয়র ময়ূর নদ ও খালগুলিকে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। যার ভিডিও চিত্র নগরবাসীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগর ভবনে প্রদর্শন করা হয়। সেখানে বলা হয় সর্বাগ্রে নদী-খালগুলির অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে সীমানা নির্ধারণ করা হবে। এর পর নদী-খালগুলি খনন করে দূষণ মুক্ত করা হবে। নদী-খালগুলির পাড় বাঁধাই করে ওয়াক ওয়ে নির্মাণ করা হবে। পাড় দিয়ে গাছ লাগানো হবে, নগরবাসীর বিশ্রামের জন্য বানানো হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সুদৃশ্য বেঞ্চ, আর নদী-খালগুলিতে চলবে বিভিন্ন ধরনের প্যাডেলবোট অর্থাৎ খুলনা শহরের চার পাশে পুরো নদী-খালগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে একটি চমৎকার বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র। আর এ রকম একটি রূপকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনা মহানগরী হবে ভেনিস নগরীর মত স্বপ্নময় সুন্দর নগর।
একপর্যায়ে শুরু হয় নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নদী ও খান খনন প্রকল্পের কাজ। নদী-খালগুলি খননের শুরুতেই হারিয়ে যেতে থাকে নদী-খালের সীমানা চিহ্নিত পিলার। ফলে সীমানা চিহ্নবিহীন নদী-খালগুলির খনন কাজও দিকচিহ্ন হারিয়ে এলোমেলো হয়ে যায়। কোথাও ওয়াক ওয়ে বানানোর জায়গা খুঁজে না পাওয়ায় রাস্তা বানানো সম্ভব হয় না। কোথাও সংকীর্ণ পাড় থাকায় এবং তার ধারাবাহিকতা না থাকায় রাস্তা বানানো সম্ভব হয় না। আর এভাবেই নদী-খালগুলি খনন সম্পন্ন হয়ে গেলেও মেয়র কর্তৃক নগরবাসীকে প্রদর্শিত ভিডিও চিত্রের স্বপ্নের পর্যটন নগরী আর গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি!    
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেসিসি’র একাধিক সূত্র জানায়, অধিকাংশ সীমানা পিলার খাল খননের সময় ঠিকাদারসহ অন্যান্যরা সরিয়ে ফেলেছে। যাতে নদী-খাল খননের চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে না হয় এবং ইচ্ছামত কাজ করা যায়। আর নদী-খালগুলির সুনির্দিষ্ট সিমানা চিহ্ন না থাকার অজুহাতে ঠিকাদাররাও খাল খননকালে মাটির রাস্তা এবং ওয়াক ওয়ে বানায়নি, ফলে ওয়াকওয়ের পাশে সুদৃশ্য বেঞ্চও তৈরি হয়নি, গাছও লাগানো হয়নি, নদী-খালে প্যাডেল বোটও ভাসেনি আর সুন্দর পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল সময়কালের মধ্যে উল্লেখিত সীমানা পিলারগুলি চুরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
কেসিসি’র সূত্রমতে, এ পর্যন্ত ৪২ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় ক্ষুদে নদী, ময়ূর নদ (আংশিক), নারকেলবাড়িয়া খাল, ছড়িছড়া খাল, তালতলা খাল ও ক্ষেত্রখালী খাল সহ দশটি খালের খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যদিও এর একটি খালের কাজও নগরবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী হয়নি।
২৯টি নদী-খালের হাজার হাজার সীমানা পিলার চুরি যাওয়ার ব্যাপারে কোন মামলা বা জিডি এন্ট্রি করেছেন কি-না জানতে চাইলে কেসিসি’র এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দিন সময়ের খবরকে বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই, কিছু জানতে হলে ফোকালপারসন বরাবর দরখাস্ত করতে হবে।” এটা তো সম্পত্তি শাখার বিষয় আর আপনি সম্পত্তি শাখার প্রধান তাই আপনার বক্তব্য জানতে চাই, এ কথার উত্তরেও তিনি সময়ের খবরকে বলেন, “আমি কিছু বলবো না।”
উল্লেখ্য, সীমানা পিলার চুরি হয়ে যাওয়ার ফলে পূর্বে উদ্ধারকৃত নদী-খালের অধিকাংশ জায়গা ভূমিদস্যুরা আবারও দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সীমানা পিলার লুট হয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোন তদন্ত হবে কি-না জানতে চাইলে কেসিসি’র প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু সময়ের খবরকে বলেন, “ইতোমধ্যে নদী-খালগুলি সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সীমানা পিলার হারিয়ে যাওয়ার সত্যতা পেয়েছি। তিনি বলেন সীমানা পিলার না থাকার কারণে অনেকস্থানে ভূমিদস্যুরা আবারও নদী-খালের জমি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। আমরা দ্রুতই আবার সীমানা পিলার স্থাপন করে নদী-খালের জমি উদ্ধার করবো এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
তিনি আরও বলেন, কেসিসি’র সম্পদ কিভাবে চুরি হ’ল তা খতিয়ে দেখা হবে। আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। উদ্ধারকৃত জমিতে আমরা গাছ লাগাবো যাতে জমির সীমানা চিহ্ন লোপাট করে কেসিসি’র সম্পত্তি আর ভূমিদস্যুরা দখল করতে না পারে।”  

প্রিন্ট

আরও সংবাদ