খুলনা | সোমবার | ১৮ মে ২০২৬ | ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে অবৈধ চারো দিয়ে কাঁকড়া শিকার

টাকার বিনিময়ে ট্রলারসহ প্রধান অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ, নৌকাসহ আটক ২

মোংলা প্রতিনিধি |
০২:১৩ এ.এম | ১৮ মে ২০২৬


বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকায় অবৈধ উপাযয়ে কাঁকড়া শিকারের সময় দু’টি কাঁকড়া ধরা নৌকা ও বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ দুই জেলেকে আটক করেছে বন বিভাগ। তবে আটক কাঁকড়া বোঝাই প্রধান ট্রলারটি এবং এর মালিকসহ বেশ কযয়েকজন প্রভাবশালী জেলেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রাতেই ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অভিযান পরিচালনাকারী বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। শনিবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের শেলা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন নিষিদ্ধ শেলার খালে এ অভিযান চালানো হয়। রোববার দুপুরের পর আটক দুই জেলের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দায়ের শেষে বাগেরহাট আদালতে প্রেরণ করা হয়।
স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় অভয়ারণ্য এলাকায় সব ধরনের প্রবেশ ও সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। তবে সরকারের এই কঠোর নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একদল অসাধু চোরা শিকারি সুন্দরবনের শেলা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন নিষিদ্ধ খালে প্রবেশ করে। তারা খালের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ ‘চারো’ (বাঁশ ও জাল দিয়ে তৈরি কাঁকড়া ধরার বিশেষ ফাঁদ) পেতে নির্বিচারে কাঁকড়া নিধন করছিল। এতে বনের পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার সন্ধ্যায় শেলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অফিস ইনচার্জ) মিজানুর রহমান এবং ফরেস্ট গার্ড (এফজি) আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে বন কর্মীদের একটি চৌকস দল শেলার খালে অভিযান চালায়। বন বিভাগের নৌযানটি খালের মুখে পৌঁছালে অবৈধ শিকারিরা পালানোর চেষ্টা করে। তবে বন কর্মীরা চারপাশ থেকে ঘেরাও করে সোহান শেখ ও ডালিম শেখ নামে দুই জেলেকে হাতেনাতে আটক করে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে কাঁকড়া শিকারের কাজে ব্যবহৃত ২টি নৌকা, সাড়ে ৩ শতাধিক নিষিদ্ধ চারো এবং কাঁকড়া বোঝাই একটি বড় ইঞ্জিন চালিত ট্রলার জব্দ করা হয় বলে স্থানীয় জেলেরা জানায়। আককদের বাড়ি রামপালের পেড়িখালী এলাকায়।
এদিকে অবৈধ চারো দিয়ে কাঁকড়া ধরার অভিযান সফল হলেও পরবর্তীতে পর্দার আড়ালে ভিন্ন নাটকীয়তার জন্ম হয় বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ উঠেছে। জব্দকৃত কাঁকড়া বোঝাই মূল ট্রলারটি রামপাল উপজেলার পেড়িখালী এলাকার চিহ্নিত ও প্রভাবশালী কাঁকড়া ব্যবসায়ী শাহাদৎ মোড়লের বলে শনাক্ত করা হয়। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার একাধিক বাসিন্দা ও জেলেরা অভিযোগ করে বলেন ট্রলারটি ফাঁড়িতে আনার পর থেকেই নেপথ্যে জোর তদবির শুরু হয়। পরবর্তীতে গভীর রাতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময় (দফারফা করে) শাহাদৎ মোড়লের কাঁকড়া বোঝাই ট্রলার এবং এর সাথে থাকা বেশ কয়েকজন মূল অপরাধীকে ছেড়ে দেয় ফাঁড়ির অসাধু কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিতে এবং নিজেদের পিঠ বাঁচাতে শুধু সাধারণ দুই দিনমজুর জেলে সোহান ও ডালিমকে আটক দেখিয়ে রোববার সকালে আদালতে পাঠানো হয়।
টাকার বিনিময় মূল অপরাধী ও কাঁকড়াসহ ট্রলার ছেড়ে দেওয়ার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি জানাজানি হলে সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা ও রামপাল এলাকার সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যারা বনের সম্পদ ধ্বংসের মূল হোতা, তারা অর্থের জোরে সব সময় পার পেয়ে যায়। আর অর্থের অভাবে ফেঁসে যায় সাধারণ গরীব জেলেরা। পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য রক্ষা করা বন বিভাগের পবিত্র দায়িত্ব¡। কিন্তু রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে এবং টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেয়, তবে সুন্দরবনের অস্তিত্ব অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে। তারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন।
নিষিদ্ধ এলাকায় কাঁকড়া শিকারের দায়ে দুই জেলেকে আদালতে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও, আর্থিক লেনদেন কিংবা কাঁকড়া বোঝাই মূল ট্রলার ও প্রধান অভিযুক্ত শাহাদৎ মোড়লকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন শেলা টহল ফাঁড়ির দায়ীত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মচারীরা। তাদের দাবি, জব্দকৃত আলামত ও আটক আসামিদের বিরুদ্ধে বন আইনে যথাযথ মামলা দায়ের করেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে জব্দ তালিকায় ট্রলারের উল্লেখ না থাকার বিষয়ে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ