খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২১ মে ২০২৬ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মিথ্যা মামলায় সাংবাদিক হয়রানি কার্যকর ব্যবস্থা নিন

|
১২:১৮ এ.এম | ২১ মে ২০২৬


গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের জবাবদিহির জন্য মুক্ত গণমাধ্যম অপরিহার্য। এ কারণেই গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এ দেশের গণমাধ্যমকে পঙ্গু করার লক্ষে সাংবাদিকদের ওপর যেভাবে হামলা, মামলা ও নির্যাতন করা হয়েছে, তার নজির দেশে তো নয়ই, বিশ্বেও বিরল। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ ও হয়রানির লক্ষে বহু মিথ্যা মামলা করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকেও বহু সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। আর সেসব মামলায় অনেক সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখনো অনেকে কারাগারে আছেন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরণের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সংগঠনটির প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৫৮৫ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন ১৭৪ জন, হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হয়েছেন ১২ জন, নাশকতা মামলার আসামি ৩৭ জন এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ছয়জন সাংবাদিক। প্রতিবেদনে বলা হয়, কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ি সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান (২৪) রাষ্ট্রের চোখে একজন ‘জুলাই শহিদ’।
কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আশিকুর আন্দোলনের ধারেকাছেই ছিলেন না। ২০২৪ সালের ১২ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত তিনি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন বিএসএমএমইউ) রেফার করা হয়। রংপুর মেডিক্যালের ছাড়পত্রে আশিকুরের রোগ হিসেবে লেখা ছিল, ‘সেপসিস উইথ ফোকাল সিজার (এইচ/ও এনকেফালাইটিস)’। কিন্তু ছাড়পত্রে মাথায় আঘাতের কোনো উলে­খ নেই।
তাঁকে ২৬ আগস্ট বিএমইউতে ভর্তি করা হয় এবং তিনি মারা যান ১ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টায়। বিএমইউ থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদে লেখা হয়, ‘সেপটিক শক উইথ একেআই উইথ মেনিনগোএনকেফালাইটিস উইথ অ্যালেজড এইচ/ও হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’। অর্থাৎ ‘দাবির ভিত্তিতে’ আন্দোলনে আহত বলে উলে­খ করা হয়। কিন্তু এমআরআইসহ এখানকার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হেড ইনজুরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর সনদপত্রে স্বাক্ষর করা চিকিৎসক স্বীকার করেন, সে সময়ের বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ‘অ্যালেজড’ শব্দটি যোগ করে এ কথা লেখা হয়েছিল। অথচ মৃত্যুর এক মাস ১০ দিন পর দায়ের করা হত্যা মামলায় তিনজন সাংবাদিকসহ ১০৪ জনকে আসামি করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় মিছিল করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার আজিজুল ইসলাম। মৃত্যুর ১১ মাস পর তাঁকে ‘জুলাই শহিদ’ দাবি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক নেতা। তাঁর সঙ্গে আজিজুলের পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই মামলায়ও দু’জন সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। অথচ আজিজুলের বাবা আব্দুর রহিম বলেন, তাঁরা কাউকে দায়ী করেননি, এমনকি কোনো মামলাও করেননি। জানা যায়, সারা দেশে এ রকম অনেক ঘটনাই ঘটেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত পর্যায়ে একটি মামলা যদি হয়রানিমূলক মনে হয়, তাহলে রাষ্ট্র মামলাটি প্রত্যাহার করতে পারে। আবার মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করার প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। আমরা মনে করি, বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ