খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২১ মে ২০২৬ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নেই মন্ত্রণালয়ের কোন প্রজ্ঞাপন বা দিক নির্দেশনা, তবুও পরিচালকের আইন!

খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোটা নির্ধারণ, আতঙ্কে কর্মচারীরা, ভোগান্তিতে রোগীরা

এস এম জাহিদ |
০১:৩৬ এ.এম | ২১ মে ২০২৬


জুলাই-আগস্টে কোটা আন্দোলনে জীবন গেলো হাজারো প্রাণ, পঙ্গু হলো শত-শত মানুষ। ফের সেই কোটা নির্ধারণের যাঁতাকলে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল’। নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোন প্রজ্ঞাপন বা দিক নির্দেশনা, তবুও পরিচালকের বেঁধে দেওয়া রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোটার (সীমাবদ্ধতা) নিয়মনীতির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা যাবে না। আর কোন স্টাফ অমান্য করলে তাকে শোকজ অথবা করা হচ্ছে বদলী। এ ক্ষেত্রে সেটা অমান্য করার কোন ক্ষমতা নেই হাসপাতালে কর্মচারীদের। বর্তমানে হাসপাতালের প্যাথলজিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১০০ জন রোগীর সীমাবদ্ধতা করে দিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক। ইসিজিতে এবং আল্টাসনোতে ২৫ জন রোগী পরীক্ষা করতে পারবে এবং এক্সরের ক্ষেত্রে ৫০ জন রোগীর সীমাবদ্ধতা করে দেওয়া হয়েছে। 
অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভালো চিকিৎসার প্রত্যাশায় রোগীরা আসেন খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালে। কিন্তু পরিচালকের নিজস্ব (কোটা) আইন চালু হওয়ায় ভোগান্তি ও নানা বিড়ম্বনায় প্রতিদিন পড়েছেন রোগাী ও তাদের স্বজনরা। সরকারী এ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা না পেয়েই ফিরছেন তারা। অন্যথায় বেসরকারি হাপাতালের শরণাপন্ন হচ্ছেন রোগীর স্বজনরা।
হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সীমাবদ্ধতার বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত মুঠোফানে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার বহির্ভূত। কেন না মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
হাসপাতাল ঘুরে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে বিভিন্ন থানা, জেলা, উপজেলা থেকে রোগীরা এসে ভীড় করে হাসপাতালে। সিরিয়াল কে পাবে, কে পাবে না সেই প্রত্যাশায় দূর-দূরান্ত থেকে মধ্য রাতে সিরিয়াল পাওয়ার জন্য রোগীদের উপস্থিতি দেখা যায়। 
আবুল কালাম নামে এক রোগীর সাথে কথা বললে তিনি সময়ের খবরকে জানান, “আমার বাড়ি গোয়ালখালী, আমি পরপর ৪ দিন এসে সিরিয়াল পেয়েছি। তাও আমার সিরিয়াল নম্বর ১৩। আমার বাড়ির কাছে হাসপাতাল হওয়া সত্তে¡ও আমি ৪ দিন পর সিরিয়াল পেয়ে আজ আল্ট্রাসনো করছি। তাহলে দূর থেকে আগত ব্যক্তিদের অবস্থা কি হতে পারে, তা আপনারাই ভাবেন।” গত ১৩ মে হাসপাতাল চত্বরেই এ কথাগুলো বলেন ভুক্তভোগী এ সেবা প্রত্যাশী।
সেনহাটি গ্রামের শাহিদা নামের এক ভুক্তভোগী রোগী বলেন, “আমি (১৩/০৫/২০২৬) রাত ২টার সময় এখানে এসে সিরিয়াল পেয়েছি। আমার বাড়ির আশেপাশের অনেক ভুক্তভোগী রোগী আমার সাথে এসেছিল কিন্তু তারা সিরিয়াল পায়নি। 
অপর দিকে এক্সরে যেখানে করা হয় সেখানে গেলে বিভিন্ন অসুস্থ রোগীদের মধ্য থেকে মাহাবুব নামের এক রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এক্সরে রুমে ৪/৫ জন রোগীকে একসাথে নিয়ে পরীক্ষা করে, তবে কোনো ভাবে ৫০ জনের বেশি রোগীর এক্সরে করা হয় না। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে রোগী এসে ফিরে যায়। প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ১০০জন রোগীর বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেনা। প্যাথলজিতে বিভিন্ন প্রকার রিপোর্ট থাকে যদি সব বিভাগ থেকে ১০০ জন রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা থাকে তবে প্রতিদিন শতাধিক রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
সরে-জমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিচালকের রুমের সামনে প্রতিদিন ৫০-১০০জন সেবা বঞ্চিত রোগীদের জটলা, যাদের অভিযোগের শেষ নেই। 
এ ব্যাপারে প্যাথলজি ইনচার্জ ডাঃ আরাফাত হোসেন বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত সেবার মান বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল কম থাকায় রোগীর প্যাথলজি পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে পারছি না। তবে এ অভিযোগের সত্য নেই বলে একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সূত্রটি আরও জানায় কিট সংকট সম্পূর্ণ মিথ্যা অজুহাত। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরে কোন প্রকার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়নি হাসপাতাল থেকে।
সূত্রটি আরও জানায়, খুলনার বেসরকারী পর্যায়ে গড়ে উঠা ডায়াগনস্টিক গুলোকে বিশেষ সুবিধা দিতে এ ধরনের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে, ফলে দূর-দুরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রতিদিনই বিড়ম্ভবনায় পড়ছেন। বাধ্য হয়ে তারা অন্যত্র থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিদের্শনা অনুযায়ী।
সূত্রটি আরও জানায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অগ্রাধিকার থাকায় বহির্বিভাগের সেবা নিতে আসা রোগীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা পারেন না কোটা নির্ধারণ হওয়ায়। ফলে ব্যবস্থাপত্র নিয়েই ফিরতে হয় নিজ গন্তব্যে।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক স্টাফ জানান, হাসপাতালে পরিচালক তার মনগড়া নিয়ম-নীতি চালু করছে। তার বেঁধে দেওয়া সীমিত সংখ্যা রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে যদি এর বেশি কেউ করেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে এমনটি করেছেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক কোন নির্দেশনা নেই, শুধু আমাদের হাসপাতালেই এমনটি হচ্ছে, ফলে দূর-দূরান্ত (সাতক্ষীরা, তালা, পাইকগাছা, পিরোজপুর, নড়াইল, যশোর) থেকে আসা ভুক্তভোগী রোগীরা তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিদিন। এনিয়ে বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে আমাদেরকে, এমনকি হাতা-হাতির পর্যায়ে  
আরও জানান, “যদি আমরা কোন বিশেষ অনুরোধে ১/২টা অতিরিক্ত সেবা দেই তাহলে আমাদের ভয় থাকে, হয়ত শোকজ চিঠি বা বদলীর মত সমস্যার বিড়ম্বনায় পড়তে পারি।” বর্তমানে হাসপাতালের সমস্ত স্টাফ পরিচালকের এ ধরণের কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ। 
হাসাপাতালের পরিচালক ডাঃ শেখ আবু শাহীনের সাথে কথা বললে তিনি সময়ের খবরকে জানান, “প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রোগী এসে সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে আমি জানি। আমাদের হাসপাতালের একটি সুনাম আছে যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট, চিকিৎসা সেবা ভাল হয়। এই সুনাম ধরে রাখার জন্য আমি বিভিন্ন সেক্টরে পরীক্ষা নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা করে দিয়েছি। 
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোন নির্দেশনা আছে কিনা এবং তার মনগড়া নিয়মনীতি বলবৎ করার এখতিয়ার আছে কিনা-এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। আগামীতে সেবার মান বাড়ানোর কথা আশ্বাস দেন তিনি। 
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ডাঃ মুজিবর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি সময়ের খবরকে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন কোন প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনা নেই, রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা সরকারি হাসপাতালে করার কোন সুযোগ নেই। তিনি এমনটি করছেন সেটা আমি শুনেছি। 
দূর-দূরান্ত থেকে ভুক্তভোগী রোগী, হাসপাতালের  স্টাফ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির কর্মচারী-কর্মকর্তা, স্থানীয় সাধারণ জনগণ এবং সুশীল সমাজের দাবি অচিরেই সীমাবদ্ধতা তুলে সাধারণ জনগনের বা ভুক্তভোগী রোগীদের প্রাপ্য সেবা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ