খুলনা | রবিবার | ২৪ মে ২০২৬ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

উপকূলীয় উদ্বাস্তু মানুষ : আম্পানের দুর্ভোগ কেন ঘুচলো না

|
১২:৪৯ এ.এম | ২৪ মে ২০২৬


২০২০ সালের ২০ মে। সুপারসাইক্লোন আম্পানের সেই ভয়াল রাত সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে দীর্ঘ মেয়াদে বদলে দিয়েছিল। কপোতাক্ষ আর খোলপেটুয়া নদীর লোনাপানি যখন ভেড়িবাঁধ ভেঙে জনপদে ঢুকে পড়েছিল, তখন মানুষ ভেবেছিল এটি সাময়িক দুর্যোগ। কিন্তু ২০২৬ সালের ২০ মে, আম্পানের দীর্ঘ ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতাপনগরের শত শত মানুষের কাছে সেই অভিশপ্ত রাত যেন আজও শেষ হয়নি। কয়েকশ’ পরিবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরতে না পেরে ভেড়িবাঁধের ঢালে কিংবা সড়কের পাশে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
প্রতাপনগরের এই চিত্র কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প নয়, বরং এটি দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার একটা বড় উদাহরণ। একটি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের মানচিত্র বদলে গেছে, কাজের অভাবে হাজারো মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, অথচ আজ ছয় বছর পরও উপজেলা প্রশাসন বলছে, তারা মানুষের এই মানবেতর জীবনের কথা ‘শুনেছে’ এবং ‘পরিদর্শন করে উদ্যোগ নেবে’। এই ‘শুনছি’ এবং ‘দেখব’ আমলাতান্ত্রিক বুলি কি দীর্ঘ ছয় বছরেও শেষ হওয়ার কথা ছিল না?
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতাপনগরের প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার মধ্যে এখনো অন্তত ৮ কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার বলার পরও স্থায়ী সমাধান না হওয়াটা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। টেকসই ভেড়িবাঁধ না থাকায় লোনাপানির আতঙ্কে মানুষ বিনিয়োগ করতে পারছে না, কৃষি ও মৎস্য চাষে ফিরতে পারছে না। এ কারণে নদীভাঙনের শিকার মানুষগুলো হয়ে পড়ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু। কেউ কাজের সন্ধানে ঢাকা যাচ্ছে, কেউ খুলনায়-প্রতাপনগর যেন আজ এক জনশূন্য জনপদে পরিণত হতে চলেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের কিছু ঘর দেওয়া হয়তো সংখ্যাতাত্তি¡কভাবে বড় অর্জন হতে পারে, কিন্তু কয়েকশ’ পরিবারের এখনো বাঁধের ঢালে ঝুপড়িতে বসবাস করাটা রাষ্ট্রের জন্য এক বড় ব্যর্থতা। ভাসমান সেতু দিয়ে চলাচল আর ঝুপড়িতে রোদে পোড়া ও বৃষ্টিতে ভেজার এই কষ্টকর জীবন আর কত দিন চলবে? বাঁধের ওপর বসবাসরত ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারকে দ্রুত স্থায়ী আবাসনের আওতায় আনতে হবে। উপকূলীয় এই মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় লবণাক্ততা-সহিষ্ণু কৃষি এবং বিকল্প আয়ের উৎস তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতাপনগরের মানুষ ত্রাণ চায় না, তারা চায় পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ