খুলনা | সোমবার | ২৫ মে ২০২৬ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কবি নজরুল জাতির পূর্ণ স্বাধীনতা ও মুক্তির বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

এড. এম মাফতুন আহমেদ |
০২:৩৮ এ.এম | ২৫ মে ২০২৬


যুগে যুগে কালের আবর্তে এই পৃথিবীতে কিছু মানুষের আগমন ঘটে। তারা একটি জাতির কান্ডারি হিসেবে আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করেন। একটি জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। উন্নয়নের পথে ধাবিত করেন। তাই তাদেরকে বলা হয় যুগশ্রেষ্ঠ। কালের কিংবদন্তি ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। নজরুল ছিলেন দুঃখময় জীবনের এক প্রতীক। 
একটি জাতি যখন দিশেহারা, তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠিক এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে ১২৭ বছর আগে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ এই মহান সাধক অবিভক্ত বাংলার প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত জনপদ চুরুলিয়া গ্রামের আক্ষরিক অর্থেই শ্যামল বাংলার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে একটি মাটির ঘরে কিংবদন্তি এই কালোত্তীর্ণ ব্যক্তিত্ব জাতীয় বীরের জন্ম হয়েছিল। তিনি যুগশ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। তিনি আমাদের অহঙ্কার। 
আজকের এই জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কোন বিষয়ের ওপর কি লিখব, অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কারণ তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি। একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, গায়ক, বাদক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক। তাই তিনি মুক্তির বাণী নিয়ে ধূমকেতুর মত কাজী নজরুল ইসলাম এই ধরণীতে আগমন হলেন। তার জন্ম ছিল একটি নিদ্রিত জাতির মধ্যে মহাজাগরণের ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রবল উত্থানে প্রকম্পিত। অনন্য সাহিত্য পুরুষ নজরুল দ্রোহ, সাম্য, চির তারুণ্য, সকল ধর্ম ও সকল মানুষের কবি। তার এক হাতে ছিল বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আরেক হাতে রণতুর্য। তার সাহিত্যে মানসের মর্মকথা ছিল মানবতার মুক্তি। নজরুল নিজের একটি গানে যেন সে আবহের জানান দিয়েছেনÑ“বাজল কি রে ভোরের সানাই নিদ মহলার আধারপুরে শুনছি আজান গগণ তলে অতীত রাতের মিনার চূড়ে”।
তিনি দিশাহারা এই জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। স্বাধীনতার মহান মন্ত্রে দিক্ষিত করেছিলেন। কবি সাধক কাজী নজরুল ইসলাম জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে অন্যতম। তাই নজরুল আমাদের প্রিয় কবি; জাতীয় কবি। এই মহান সাধক অসা¤প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। ছিলেন বলে নানা দুঃখ যাতনার মধ্যে থেকেও এই জনপদের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রনের প্রশ্নে সর্বোপরি আশাআকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি নিপীড়িত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পিছিয়ে পড়া মজলুম মুসলমানদের অনুপ্রেরণা জাগাতে চেয়েছেন, চেয়েছেন ব্রিটিশ হটিয়ে উপমহাদেশের মানুষের স্বাধীনতার ঝানডা উড্ডীন করতে। এসব লক্ষ্য অর্জনে তিনি কলম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। রাজনীতির মাঠকে গরম করেছিলেন। স্ব-ধর্মের চেতনায় উজ্জীবিত থেকেও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সাধনে সচেষ্ট থেকেছেন। একথায় তার মধ্যে ছিলো স্বদেশপ্রীতি, স্বাধীনতা প্রীতি ও সাম্যবাদী মনোভাব। 
লেখনীর মাধ্যমে তিনি পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে ব্রিটিশের অন্যায়-অপশাসনের বিরুদ্ধে গোটা বাঙালি জাতিকে এক ঐতিহাসিক দিকনিদের্শনা প্রদান করেছিলেন। তিনিই প্রথম যিনি এই উপমহাদেশের মজলুম মানুষকে সরাসরি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কলম যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার আহবান জানিয়ে ছিলেন। দৃপ্তকণ্ঠে তিনিই সর্বপ্রথম বাঙালি যিনি উ”চারণ করেছিলেনÑ 
‘কারার ঐ লোহ-কপাট
ভেঙ্গে ফেল করবে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল পূজায় পাষাণ বেদী.... 
অবদমিত, ষড়যন্ত্র ও হিংসায় আক্রান্ত, আত্মবিস্মৃতি জাতিকে আগে কেউ এই আহŸান জানাননি। তিনিই বলেছিলেনÑ “বল বীর, চির উন্নত মম শির”। 
কবির এই আহবান ছিল পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ বাঙালি জাতির প্রতি স্বাধীনতার মন্ত্রে দিক্ষিত হবার আহবান। তিনি গর্জে ওঠেছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা ও জাতির মুক্তির জন্য। কোনও অবস্থাতেই তিনি দখলদার ইংরেজ সরকারের তাবেদারি মেনে নেননি। দায়বদ্ধতার কারণে নিতে পারেননি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পান্ডাদেরকে সমঝে চলেননি; প্রতিষ্ঠিত গোত্র বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পক্ষপুটে আশ্রয় নেননি। শুরু থেকে শেষতক পর্যন্ত তিনি স্বজাতির কবি ছিলেন; মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন; জাত-পাত-ক্ষুদ্রতার বিরোধী ও বিনাশী ছিলেন। অবিচারের বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল বরাবরই সোচ্চার। তিনি সাম্রাজ্যবাদ বা শোষক শ্রেণির কাছে নতি স্বীকার না করে অসংকোচে বলতেনÑ“আপনি আপনারে ছাড়া কাহারে করি না কুর্নিশ”। 
সকল অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে সাবধান বাণী শুনিয়ে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেনÑ“যেথায় ভন্ডামি ভাই করবো সেথায় বিদ্রোহ ধামাধরা, জামাধরা মরণভীতু চুপ রহো”।
বৈষম্যপূর্ণ সমাজের করুণ আর্তনাদই নজরুল রচনার মূল সনদ। তিনি সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। শানিত কলম উঁচু করেছেন। কাব্যে তার ভাব প্রকাশ করেছেন এভাবে।  “প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশা”।
সেই দেশটিই আজকের বাংলাদেশ। আজকের বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও স্বপ্ন, বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতা ও সংগ্রামশীলতা, সর্বোপরি পরাধীনতা থেকে রাষ্ট্র ও মানুষের সাংস্কৃতিক-আত্মিক-রাজনৈতিক মুক্তির কথা আমাদের কাছে,আমাদের জন্য, নজরুল ছাড়া আর কেউ এতো সাহসের সঙ্গে স্পষ্টভাবে বলতে পারেননি; নজরুল ভিন্ন আর কেউই তাই আজকের বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জাতিসত্তার এতোটা কাছে এসে স্বজনের সহৃদয়তায় দাঁড়াতে পারেনি; নজরুল ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের জাতীয় কবির স্বীকৃতি দাবি বা প্রত্যাশা করতে পারেননি। তাই তিনিই আমাদের জাতীয় কবি। আমাদের দ্রোহের সংগ্রামে, বিপ্লবে বিদ্রোহে নজরুল জাতীয় চেতনায় উজ্জ্বলতম বাতিঘর। দুঃখ,দারিদ্র্য ও কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাহিত্য সাধনার সকল তুঙ্গস্পর্শী সাফল্য ও জনপ্রিয়তা সত্তে¡ও ব্যক্তিগত বেদনার নির্বাক জীবন-যাপন শেষে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১১ ভাদ্র সকাল ১০টা ১০ মিনিটে এই জ্যোতির্ময় সাহিত্য পুরুষ রাজধানীর বর্তমান ঢাকা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী দুখ মিয়া নামের শিশুটি এখন ঘুমিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।
তিনি আমাদের জাতীয় কবি। কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং বলিষ্ঠ প্রেরণাদানকারী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন আজ অনাদরে? কেন আজ তার প্রতি এত অবহেলা? তিনি বলেছিলেনঃ  “আমি চির তরে দূরে চলে যাব তবুও আমারে দেব না ভুলিতে”। 
কবির এমন আশা-আকাক্সক্ষা পূরনে জাতীয় প্রচেষ্টার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। কবির নামে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যদিও ময়মনসিংহে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জাতীয় কবির মাজার ঘিরে জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা আলোর মুখ কবে দেখবে তা কেউ জানে না। জাতীয় কবি হিসেবে তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি। চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নজরুল চেয়ার’ স্থাপন করা হলেও তার কোন কার্যক্রম নেই। নজরুল ইনস্টিটিউটও চলছে গঁৎ বাঁধা ছকে। জাতীয় কবির প্রতি এতো অবজ্ঞা, এতো অবহেলা কেন? নজরুলভক্ত সহ সুধীমহল আজকের এই জন্ম বার্ষিকীকে সামনে রেখে এর অবসান চান।  
লেখক : আইনজীবী, কলামিষ্ট সম্পাদক ও আজাদ বার্তা। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ১ মাস আগে