খুলনা | সোমবার | ২৫ মে ২০২৬ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভিডিও প্রকাশের পর ঘটনার ভিন্ন মোড়

সুন্দরবনে গুলিতে জেলে নিহতের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০২:৪৮ এ.এম | ২৫ মে ২০২৬


সুন্দরবনে গুলিতে আমিনুর গাজী (৪৫) নামে এক জেলে নিহতের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে থানায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ ও নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের হয়েছে কয়রা থানায়। গতকাল রোববার রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন ভাঙচুরের ঘটনায় শ্যামনগর থানায় বনবিভাগের পক্ষে আরেকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল। এদিকে, দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে ওই দিনের ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। এরপর থেকেই ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ মে সকালে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের আওতাধীন সংরক্ষিত অভয়ারণ্য এলাকার পাটকোষ্টা বন টহল ফাঁড়ির জালিয়া খালের একটি শাখা খালে।
বন বিভাগের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে খুলনা স্মার্ট টিম-২ সংরক্ষিত অভয়ারণ্যের নিষিদ্ধ এলাকায় দু’টি ডিঙ্গি নৌকা দেখতে পায়। টহল দল কাছে গেলে জেলেরা নৌকা ফেলে বনের মধ্যে পালিয়ে যায়। পরে বনকর্মীরা নৌকা ও বন অপরাধের আলামত জব্দ করতে গেলে সংঘবদ্ধ জেলেরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে কয়েকজন বনকর্মী আহত হন।
এজাহারে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে ফরেস্ট গার্ড আতিয়ার রহমান আত্মরক্ষার্থে একটি ফাঁকা গুলি করেন। পরে ধস্তাধস্তির সময় আরেক ফরেস্ট গার্ড আসাদুজ্জামানের রাইফেলের ট্রিগারে চাপ দেয় জেলে রবিউল ইসলাম। এতে অস্ত্র থেকে গুলি বের হয়ে আমিনুর নামে অপর জেলের গায়ে লাগে। পরে অন্য জেলেরা তাকে নিয়ে বনের মধ্যে চলে যায়।
ঘটনার পর শরবতখালী বন টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ ও স্মার্ট টিম-২ এর টিম লিডার মোঃ মুক্তাদির রহমান কয়রা থানায় মামলা করেন। মামলায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সোরা গ্রামের রবিউল ইসলাম ও ওয়ায়েস কুরুনীসহ অজ্ঞাত আরও দুইজনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায় প্রথমে স্মার্ট টহল টিমের সদস্যরা সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় দু’টি নৌকা দেখতে পেয়ে তাদেরকে ডাক দেয়। এ সময় জেলেরা নৌকাসহ মালামাল ফেলে রেখে বিচ্ছিন্ন ভাবে পালিয়ে যায়। পরে স্মার্ট টিমের সদস্যরা ট্রলারে করে নৌকা দু’টি বেঁধে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করতে থাকে। এসময় জেলেরা সংঘবদ্ধভাবে ফরেস্টারদের ওপর হামলা করে। একপর্যায়ে হামলা ঠেকাতে বন বিভাগের কর্মীরা তাদের একটি নৌকা নিয়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করে। তবে জেলেরা আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে দু’টো নৌকাই ফেরত নেওয়ার জন্য ফরেস্টারদের দিকে তেড়ে আসে। এসময় এক ফরেস্টারকে বলতে শোনা যায় ‘আপনারা অপরাধ করছেন, একটা নৌকা নেন। নিয়ে চলে যান। আপনারা দাঁড়ান.....আমার কথা শোনেন। নৌকা সামনে পাবেন। জীবনে অনেক ইনকাম করতে পারবেন।’ তবে জেলেরা অনেকটা আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে দু’টো নৌকাই নেওয়ার জন্য সামনে এগোতে থাকে। এক পর্যায়ে এক ফরেস্টার ফাঁকা গুলি করার জন্য নির্দেশ দেয়। সেসময় একটি ফাঁকা গুলির শব্দও শোনা যায় ভিডিওতে। ওই সময় ভিডিও বন্ধ হয়ে যায়।
এরপরের বর্ননা দিয়েছেন স্মার্ট টিমের লিডার শরবতখালী বন টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ মোঃ মুক্তাদির রহমান। তিনি বলেন, সেসময় জেলেরা মারমুখি হয়ে হাতে থাকা বৈঠা দিয়ে আঘাত করে। এতে ফরেস্টার আতিয়ার রহমানের হাতে থাকা রাইফেলটি ভেঙে যায়। অপর গার্ড আসাদুজ্জামানের হাতে থাকা রাইফেলটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে জেলে রবিউল ইসলাম। সেসময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে জেলে রবিউল ট্রিগারে চাপ দেয়। এতে রাইফেল থেকে গুলি বের হয়ে পাশে থাকা অপর ব্যক্তির (আমিনুর গাজি) গায়ে লাগে। এতে সে ঘটনাস্থলেই জখম হয়ে পড়ে। পরে জেলেরা তাকে উদ্ধার করে পালিয়ে যায়।
বন বিভাগের দাবি, অভিযুক্ত জেলেরা সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে পাস (পারমিট) নিয়ে খুলনা রেঞ্জে মাছ ধরতে প্রবেশ করেছিলেন, যা নিয়মবহির্ভূত। এছাড়া চার জেলের মধ্যে দুইজনের কোনো বৈধ পাস পারমিটও ছিল না। এসব কারণে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছিলো স্মার্ট টিমের সদস্যরা।
সুন্দরবন সদর এসিএফ শামীম রেজা মিঠু বলেন, ঘটনার দিন আমি শহরে ছিলাম। তার সব ডকুমেন্টস রয়েছে। এসও মোবারকও ছিল অন্য ডিউটিতে। অথচ আমাদের নামে মামলা হলো। এটি পরিকল্পিত।
এদিকে, নিহতের ভাতিজা অলিউল্যাহ কয়রা থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করেন, নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের এসও মোবারক হোসেন ও সহকারী বন সংরক্ষক শামীম রেজা মিঠুসহ বন বিভাগের কয়েকজন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে জেলে ও বাওয়ালিদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করতেন। এ নিয়ে আমিনুর গাজীর সঙ্গে তাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। খুনের অভিযোগে কয়রা থানায় মামলা করেছেন নিহতের ভাইয়ের ছেলে ওলিউল্লাহ। এজহারে বলা হয়, গত ১৮ মে সকালে আমিনুর গাজী, অলিউল্যাহ ও অন্যরা পাটকোষ্টা এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া ধরছিলেন। এসময় বন বিভাগের সদস্যরা স্পিডবোট ও ট্রলার নিয়ে সেখানে যান। একপর্যায়ে মোবারক হোসেন রাইফেল দিয়ে আমিনুর গাজীকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। গুলি তার শরীর ভেদ করে বের হয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ওই দিনের ঘটনা জানতে কথা বলতে চাইলে নিহতের ভাতিজা অলিউল্লাহ এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাতক্ষীরার গাবুরা এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ লোকজন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট রেঞ্জ ও স্টেশন অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। এতে কয়েকজন বন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হন। লোকজন পুরো ফরেস্ট স্টেশনকে ভাঙচুর করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর সময়ের খবরকে বলেন, ভিডিওতে পুরো বিষয়টা ক্লিয়ার হয়েছে। ডিউটি পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে বনপ্রহরীরা। এরপর একটি সরকারি অফিস ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই সবকিছু থেমে থাকেনি। সদর সহকারি বনসংরক্ষক শামীম রেজা মিঠু ও নলিয়ান স্টেশন কর্মকর্তা মোবারক হোসেন স্মার্ট পেট্রলিংয়ে ছিলো না। তাদের নামে মামলা হয়েছে। এসিএফ ছিলেন শহরে। আর মোবারক ছিলেন অন্য ডিউটিতে। এই নিহত হওয়ার বিষয়টিকে নিয়ে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।
মামলার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কয়রা থানার এস আই মোঃ সোহাইল বলেন, উভয় পক্ষই মামলা করেছে। তদন্ত চলছে। শিগগিরই ঘটনার প্রতিবেদন দিতে পারবো।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ