খুলনা | মঙ্গলবার | ২৬ মে ২০২৬ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কুরবানির মর্মকথা ও জরুরী নিয়মাবলী

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০১:৫৬ এ.এম | ২৬ মে ২০২৬


আরবি শব্দ আদহা বা আযহার বাংলা প্রতিশব্দ হলো কুরবানি। কুরবানি অর্থ নৈকট্য, উৎসর্গ, বিসর্জন ও ত্যাগ ইত্যাদি। কুরবানি হলো ঈদুল আযহার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কুরবানি আমাদের সামনে নিয়ে আসে ত্যাগের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যও বটে। কুরবানি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, আমি নির্ধারণ করেছি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির নিয়ম যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুর উপরে (সূরা হজ্জ: ৩৪)। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ এই তিন দিন আল্লাহর নামে হালাল পশু নির্দিষ্ট নিয়মে জবেহ করার নামই কুরবানি। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নিজের সর্বাধিক প্রিয়বস্তু আল্লাহর রেজামন্দির জন্য উৎসর্গ করাই হলো-কুরবানির মর্মকথা।
কুরবানি কার উপর ওয়াজিব : প্রত্যেক সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী, পূর্ণ বয়স্ক এবং মুকীম (মুসাফির নয়) ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব যাদের কাছে  ১০ জিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ জিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিসাব পরিমাণ মাল আছে। তবে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য যাকাতের নিসাবের মত সম্পদের মালিকানা এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। 
কুরবানির পশু কেমন হবে : কুরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানি জায়েয নয়। এমন দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানি করা ঠিক নয়। যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারাও কুরবানি করা ঠিক হবেনা। যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানি জায়েয নয়। যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানি জায়েয নয়। যে পশুর দু’টি চোখই অন্ধ বা এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট সে পশু কুরবানি করা জায়েয নয়। 
নাবালেগ বাচ্চার কুরবানি: নাবালেগ শিশু-কিশোর এবং তদ্রুপ যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানি করলে তা সহীহ হবে।
কুরবানির পশুর বয়সসীমা: উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কুরবানি করা জায়েজ। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়স হতে হবে। উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানি যাবে  না। 
শরীক নির্বাচনে সতর্কতা:
শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানি সহীহ হবে না। যদি কেউ আল্লাহ তায়ালার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়ত করে কুরবানি করে তাহলে তার কুরবানি সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানি হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে।
জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া: আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (স.) আমাকে তাঁর (কুরবানির উটের) আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। তিনি কুরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদনের কাপড় ছদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেছেন, আমরা তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজের পক্ষ থেকে দিব (বুখারী ও মুসলিম)। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পরপর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারি দেওয়া যাবে।
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে : অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি  আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। 
কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা: কুরবানির চামড়া কুরবানিদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। পরিশেষে সকল পাঠকের প্রতি অনুরোধ যে, কুরবানির সূক্ষè মাসয়ালা ও নিয়ম-কানুন জানার জন্য অবশ্যই কোন বিজ্ঞ আলেমের স্মরণাপন্ন হবেন। 
লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ