খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৪ জুন ২০২৬ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রায় ৫০ বছর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে খন্ড স্মৃতি

জিয়া অমর, জিয়া মৃত্যুঞ্জীবি, জিয়া চির ভাস্বর, জিয়া বেঁচে আছে তার দর্শনে, তার কীর্ত্তিতে, তার মহত্বে মুহাম্মদ

আবু তৈয়ব, খুলনা |
০১:০৭ এ.এম | ০১ জুন ২০২৬


লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধান মন্ত্রী নির্বাচিত হবার পর তারেক রহমান সরকারি গাড়ি এবং প্রটোকল সুযোগ সুবিধা নেন না। সড়ক পথে চলাচল কালে অন্য যানবহনের মত প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী গাড়িও ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি জ্বললে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি থেমে থাকে সাধারণ যে কোন অন্য যানবাহনের মত। যা নতুন প্রজন্মের কেউ আগে দেখিনি। বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন ইউটিউবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলে কথা বলেছেন। জনপ্রিয় ইউটিউবর কনক রহমানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রধান মন্ত্রী সর্ব সাধারনের সাথে মিশে যাওয়া একদম বিরল সাথে সাথে ঝুঁকিপূর্ণ ।
স¤প্রতি প্রধানমন্ত্রী বাস যোগে যাওয়ার পথে একজন মা তার শিশুকে কোলে নিয়ে হাত নেড়ে পুলিশের বেষ্টনি ভেঙ্গে যাবার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টিতে পড়েতেই তিনি বাস থামিয়ে সেই মহিলার শিশুকে কোলে তোলেন শিশু এবং শিশুর মায়ের ইচ্ছা অনুসারে তাদের সাথে সেলফিও তোলেন। ১৭ বছর পর তারেক রহমান যখন প্রথম দেশে ফেরেন তখন বিমানবন্দরে জনতাদের আসতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ছিলেন অন্য বিমান যাত্রীদের দুর্ভোগ হবে ভেবে। বিমান যাত্রীরা যাতে হয়রানি না হয় আর সড়কে সাধারণ ভাবে চলাচল করা দেখে আমার নিজ চোখে দেখে খন্ড খন্ড স্মৃতি মনে পড়ে। প্রায় ৫০ বছর আগেরকার কথা। দেশে তখন প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৬ সালে আমি তখন সুন্দরবন কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র। তখন বৃহত্তর খুলনা-যশোরে সকল সংবাদপত্র আসতো বাংলাদেশ বিমানে যশোর বিমান বন্দরে। আমার মরহুম পিতার সংবাদপত্র এজন্সীর ব্যবসা সেই পাকিস্তান আমলে হতে। পিতার ব্যবসার সাহায্য করার জন্য পড়াশুনার পাশাপাশি রোজ ভোরে যশোর বিমান বন্দরে যেতে হত কাগজ মিলিয়ে আনতে। খুলনা শিববাড়ী মোড় হতে বিমানের বাসে রোজই যেতাম। কারন না গেলে পত্রিকা কম বেশী হয়ে যেত। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোর বিমান বন্দরে গিয়ে জানলাম সেদিন সকালের বিমানটি ভিআইপি ফ্লাইট। ভিআইপি ফ্লাইট কারন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আসবেন। আর ভিআইপি ফ্লাইট হলে সে বিমানে পত্রিকা আনা হয় না। বিমান বন্দরে কড়াকড়ি একটু বেশী তাই। সেনাবাহিনীর সদস্যদের আগমন। এর মধ্যে বিমান নামার পূর্ব মুহূর্তে এলেন সুন্দর চেহারার মুখে কড়া গোভ ওয়ালা এক অফিসার এলেন খোলা জীবে। পরে জানালাম তিনি মেজর জেনারেল মীর শওকাত আলী যশোর সেনানিবাসের জিওসি।
বয়স কম তরুণ যুবক তাই আগ্রহ নিয়ে প্রেসিডেন্টকে দেখা জন্য বিমান বন্দর হতে বের হবার স্থানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সেদিনই প্রেসিডেন্ড এসেছিলেন উলশি খাল খনন কাজ উদ্বোধন করতে। মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীসহ অনেকেই প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে বিমানের দোর ঘোড়ায় চলে গেলেন। বিমানের দরজা খোলার পর প্রথমই সিড়ি বেয়ে নীচে নামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। চোখে কালো রিবন চশমা [যত দুর মনে পড়ে] সাফারি ড্রেস পরা প্রেসিডেন্ড বগলে ছড়ি নিয়ে হেঁটে হেঁটে আসলেন। নিরাপত্তা বেষ্টনি পার হবার পর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে হাত নাড়িয়ে স্বাগত জানান। আমি বার বার পুলিশ বেষ্টনি ছেড়ে সামনে এগিয়ে হাত নাড়ছিলাম। আমার হাত নাড়ানো আর বয়স কম দেখে প্রেসিডেন্ট জিয়া আমার কাছে আসেন আমিসহ কয়েক জনের সাথে হাত মিলান। আমার পিঠে চাপড় দিয়ে বলেন “হ্যালো ইয়ং ম্যান”। প্রেসিডেন্ড এর সাথে হাত মিলানো আর পিঠ চাপড় পেয়ে আমিও খুব উফুল্ল হলাম। কিন্তু মনে কষ্ট ছিল যে এই ফ্লাইটে পত্রিকা আসবে না দুপুরে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট তার বহর নিয়ে চলে গেলেন। পরে বিমানের ট্রলিতে পত্রিকার নামছে দেখে মনকষ্ট ভুলে গেলাম। পরে খোঁজ নিয়ে জেনে ছিলাম প্রেসিডেন্ট জিয়া নিজে সংবাদপত্র অফলোড করতে নিষেধ করে ছিলেন। পরে  যশোরের সংবাদপত্র এজেন্ট ইজাহার আলী , আনোয়ার আলম ব্রাদার্স এর ভাই খুরশিদ আমরা কাগজ মিলানো শুরু করি। 
ইতিমধ্যে ঢাকার যাত্রী নিয়ে বিমান টেকওভার করেছে। ৫/৭ মিনিটের মধ্যে দেখি খোলা জীব চালিয়ে মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী যশোর বিমান বন্দরে ফিরে এলেন এবং সোজা স্টেশন ম্যানেজারের রুমে। সংবাদের ব্যাপারে আগ্রহ থাকায় আমিও সেখানে গেলাম। বিমান বন্দরে মাসের ত্রিশ দিনই আমার পত্রিকা আনতে যাওয়া পড়ত তাই কোন বিধি নিষেধ [আমাদের পত্রিকার এজেন্টদের] ছিল না।
স্টেশন ম্যানেজারের রুমে ঢুকেই মেজর জেনারেল মীর শওকাত আলী জানান, বিমানের ব্যাঙ্কারে প্রেসিডেন্টের ফাইল/ডাইরী রয়েছে। সেটি নিতে তিনি এসেছেন। স্টেশন ম্যানেজার তাকে জানান বিমান টেকওভার করেছে এবং প্রায় ফরিদপুরের কাছাকাছি চলে গেছে! এখন বিমান ফেরাতে হলে প্রেসিডেন্ট এর অনুমতি লাগবে। তখন মীর শওকত আলী প্রেসিডেন্ট এর সাথে ওয়্যারলেসে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট তখনও যশোর সেনানিবাসে ছিলেন বলে জেনেছি। প্রেসিডেন্ট বিমান টেকওভার করেছে শুনে  জবাব দেন, “না বিমানকে ফেরাতে হবে না, তাহলে যাত্রীদের কষ্ট হবে। ঢাকা অফিসকে বলে দাও তারা তেজগাঁও বিমান বন্দরে গিয়ে ওটি সংগ্রহ করে রাখতে।”
প্রেসিডেন্টের এই কথা শুনে বিমান কর্মীরা হতবাক। আমি নিজ কানে শুনে আমার মনে প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে শ্রদ্ধা বোধ জাগলো। তরুন বয়সে আমি সে দিন প্রেসিডেন্ট জিয়া উর রহমানের এই সহজ সরল উদারতা সর্ব সাধারনের সাথে মিশে যাওয়া আর ক্ষমতা থাকার পরও সেটি ব্যবহার না করে যাত্রীদের কথা চিন্তা করে নিজের কষ্ট স্বীকার আমার হৃদয় স্পটে একটা বড় জায়গা করে নিয়েছে। আজ যখন দেখি জিয়া উর রহমানের পরবর্তীতে বিশেষ করে বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রধান মন্ত্রী হিসাবে চলাচলে জন সাধারণকে কিভাবে ভোগান্তির কবলে পড়তে হয়েছে। শেখ হাসিনা পুত্র কন্যা যে দিনে পদ্মা সেতু দেখতে আসেন সেদিন ঘন্টার পর ঘন্টা সর্ব সাধারনের জন্য চলাচল বন্ধ ছিল।
পত্রিকার ব্যবসা থাকায় সুবাদে কিশোর কাল হতে সংবাদপত্রের একজন নিয়মিত পাঠক আমি। নিয়মিত পত্রিকাতে দেশ বিদেশের খবরাখবর ছিল আমার খোরাক। দিন ক্ষণ সঠিক মনে নাই তবে পত্রিকায় পড়েছিলাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে গেলেন। তখন ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল দেখে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের কাছে চলে গেলেন। তিনি ছাত্রদের কাছে জানতে চান বলেন “তোমরা কি চাও?” প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই কর্মকান্ডে তার নিরাপত্তা কর্মীরাও হতবাক হয়ে গিয়ে ছিলেন। তবে সেদিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মকান্ডে তিনি ছাত্রদের মন জয় করে ছিলেন। তখন সেখানে কোন লাঠিচার্জ বা পুলিশের অন্য কোন এ্যাকশান নিতে হয়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই সাহসী কর্মকান্ড শিক্ষার্থীদের মনে দাগ কেটে ছিল। জিয়াউর রহমানকে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নিতে হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে শাসন আমলে ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে থেকে প্রেসিডেন্ট বিচার পতি আব্দুস সাত্তার আমলে এন এস আই [জাতীয় গোয়েন্দা নিরাপত্তা সংস্থা] মহা পরিচালক ছিলেন এস আবদুল হাকিম। “জিয়াকে যেমন দেখেছি” লেখা বইটি আমার নাম লিখে তিনি আমাকে দিয়েছিলেন ১৯৯৩ সালের দিকে । সেই বইতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া উর রহমানকে নিয়ে তার অনেক স্মৃতিচারণ মূলক লেখা রয়েছে।
এস আবদুল হাকিম বইটিতে এক জায়গায় লিখেছেন জিয়াউর রহমানের ছেলেরা বা তার আত্মীয় স্বজন কোন দিন ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন বলে কেউ জানেনা। প্রেসিডেন্ট এর ছেলেরা স্কুলে যেতো সাইকেলে চড়ে, তাও পুরাতন। প্রেসিডেন্ট হিসাবে তিনি এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আর এক ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন সেটা হচ্ছে স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব দেখিয়ে। তাঁর সবচেয়ে বড় শত্র“ও কোনদিন তাঁর স্বজনপ্রীতির কোন উদাহরণ আনতে পারবে না। উন্নয়নশীল দেশে বেশীর ভাগ রাষ্ট্রনায়করা স্বজনপ্রীতির ব্যাপারে সমালোচনার উর্ধ্বে নন। রাষ্ট্রপতিদের স্বজনপ্রীতি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই 
সাধারণ মানুষ মেনে নেন। রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় স্বজন সাধারণতঃ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাঙ্কের পরিচালকেরও থেকে এবং সমাজের সর্বস্তরে আলাদা সুযোগ সুবিধা পেয়ে যান, আসলে সবাই খুশী করবার জন্য এমনকি নিয়ম বহির্ভূত সুযোগ সুবিধা দান করে নিজেদেরকে কৃতার্থ মনে করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সময় ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো। তার আত্মীয় স্বজনকে কোন অফিসার বা কোন মহল কোন সুযোগ সুবিধা দেবার সাহস পেতেন না। কারণ, যদি 
তিনি ঘূর্ণাক্ষরেও তা জানতে পারতেন তাহলে সেই অফিসার সরকারি হোক বা বেসরকারি হোক তাঁর কোপ দৃষ্টিতে পড়ে যেতেন। জিয়াউর রহমান নিজে কখনও বেআইনী অথবা নিয়মবহির্ভূত কোন সুবিধা দেবার কথা কাউকে অনুরোধ করেননি। তিনি নিদের্শ দিয়েছিলেন যে, কোন মন্ত্রী বা কোন অফিসার যেন নিয়মবহির্ভূত কোন কাজের জন্য সুপারিশ না করেন। তাঁর সময় মন্ত্রীরা এবং সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা তাঁকে যথেষ্ট ভয় করতেন এবং তাঁর নির্দেশ বরখেলাপ করতে সাহস পেতেননা। এরশাদের সময় অবশ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এরশাদের আত্মীয় স্বজন ও এরশাদের মন্ত্রীদের আত্মীয় স্বজন ও চাটুকারের দলই সমাজের সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করার অধিকার লাভ করে। স্বজনপ্রীতিই এরশাদ সরকারের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। স্বৈরাচারী সরকার যে স্বজনপ্রীতির ধারা প্রবর্তন করে গেলেন এর পরিবর্তন করতে সাহসী ও শক্তিশালী পদক্ষেপের প্রয়োজন। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন স্বজনপ্রীতি জাতির সুষ্ঠু উন্নয়নের অন্তরায়, স্বজনপ্রীতির অর্থই হলো মেধা ও উপযুক্ততাকে অবহেলা করে আত্মীয়তা ও পরিচয়কেই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে স্থির করে নেয়া। সে অবস্থায় যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হবে এবং অযোগ্য ব্যক্তি আত্মীয়তা ও পরিচয়ের কারনে যোগ্য ব্যক্তির উপর স্থান করে নেবে। তিনি এও বুঝেছিলেন যে রাষ্ট্রপরিচালক হিসেবে তাঁকেই প্রথমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তা না হলে শুধু উপদেশ আর নির্দেশ দিলে সেই উপদেশ অথবা নির্দেশের কোন কার্যকারিতা থাকবেনা, সেজন্য তিনি স্বজনপ্রীতির ব্যাপারে এতো কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন।
বইটির ২৩ পাতায় লেখা রয়েছে, জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে তারেক সেন্ট জোসেফ স্কুলে পড়ত, স্কুলটা বিশেষ নাম করা আর স্কুলের নিয়মকানুন অত্যন্ত কড়া। কোন ছেলের পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক না হলে সেই ছেলেকে আর স্কুলে রাখা হতনা। তারেকের পরীক্ষার ফল সেবার সন্তোষজনক ছিলনা, তাই স্কুলের ব্রাদার তাকে স্কুল থেকে আইন অনুসারে বের করে দেন। ব্রাদার মনে হয় জানতেন না যে, তারেক প্রেসিডেন্টের ছেলে। যখন সেটা জানলেন তখন ব্রাদার অত্যন্ত সঙ্কোচের সঙ্গে প্রেসিডেন্টকে নিয়মমাফিক কাজ করেছেন। তখন তিনি ব্রাদারকে বললেন, “আপনার কোন চিন্তা নেই, আপনি ঠিকই করেছেন” ব্রাদার তাঁর কথায় অভিভূত হলেন। কোন উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্র পরিচালকের কাছ থেকে এমন ব্যবহার আশা করা খুবই আশ্চর্য্যজনক।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতা ও উচ্চপদে আসীন আমলারা যদি তাঁর দৃষ্টান্ত মেনে চলতেন তাহলে আমাদের সমাজ অনেক বদলে যেত।
শুনেছি জিয়াউর রহমান একবার একটি সরকারি জমি নিজের নামে বরাদ্দ পেয়েছিলেন, কিন্তু সময়মত কিস্তির টাকা দিতে অসমর্থ হওয়ায় তিনি সেই জমির মালিক হতে পারেননি। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন জমিহীন, প্রায় কপর্দকহীন।
জিয়াউর রহমানের নিমন্ত্রণে বহু রাষ্ট্রীয় অতিথি এ দেশে এসেছিলেন, তাদের সম্মানে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় ভোজ হতো এবং সাধারণতঃ সেই ভোজের পর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। পদাধিকার বলে তিনিও ও সস্ত্রীক নিমন্ত্রিত হতেন। নেপালের রাজা ও রাণী যখন রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন সে সময়ের একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করতে চাই। রাজা ও রাণীর সফর উপলক্ষে রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বিশেষ ব্যাপারে ব্যস্ততার জন্য তিনি আগেই স্থির করেছিলাম যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হবার পরপরই তিনি বঙ্গভবন থেকে বেড়িয়ে পড়বেন। একটু পেছনের দিকে বসেছিলাম যেন কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করেই বেড়িয়ে আসতে পারি। হল ছেড়ে যখন বেড়িয়ে আসার সময় তার হঠাৎ নজরে পড়ল প্রেসিডেন্টের এডিসি প্রেসিডেন্টের দুই ছেলেকে নিয়ে একদম পেছনের সারিতে বসা। তিনি এডিসিকে বলেলেন, “ওদের নিয়ে এতো পেছনে রয়েছেন কেন? ওদের নিয়ে আরও সামনে যেতে পারেন, সামনের দিকে সিট খালি আছে”। এডিসির উত্তর সাহেব জানেন না যে তার ছেলেরা এখানে আছে, জানলে বিপদ হবে আমার এবং ওদের।
শুনে তিনি অবাক হলাম। কাচুমাচু হয়ে এডিসি বললেন, “স্যার, প্রেসিডেন্ট সাহেব জানেন না যে তারা এখানে এসেছে ওদের। কারণ, ওদের এ সময় বঙ্গভবনে আসা নিষেধ। তাই ওদের নিয়ে এতো দূরে বসেছি। আপনি স্যার যেন প্রেসিডেন্ট সাহেবকে জানাবেন না।” এই ছিলেন জিয়াউর রহমান। নিজের ছেলেদেরও এই সরকারী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ দিতেন না পাছে এও স্বজনপ্রীতির সংজ্ঞার মধ্যে এসে যায়।
বইয়ের উপসংহারে লেখক লিখেছেন জিয়ার মৃত্যুতে দেশ হারল একজন মহান দেশ প্রেমিক, একজন অদর্শপরায়ন, আত্মত্যাগী জননেতা। ওয়শিংটন পোষ্ট পত্রিকার সংবাদদাতা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশী জনগণের প্রতিক্রিয়ার উপর এক রিপোর্ট পাঠান। সে রিপোর্টে ৬৭ বছর বয়স্ক এক বৃদ্ধ ইমন আলী সরকারের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, ইমন আলীর কথা, “আমরা যেন এতিম হয়ে পড়লাম। তার মত আর কোন প্রেসিডেন্ট গ্রাম থেকে গ্রামে, দ্বার থেকে দ্বারে ঘুরে বেড়াবেন কিনা সন্দেহ! তার স্থান পূরণ করা কঠিন হবে।"
তিনি তার এই বইয়ে লিখেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া উর রহমানে দাফন সম্পন্ন পর সারাদেশ থেকে মানুষ গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতো। দাফর সম্পন্ন ১০/১২দিন পর লেখকের এক বন্ধু গিয়ে ছিলেন শহীদ জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে। তখন তার বন্ধু দেখেন একদল ভিক্ষুক।
কৌতুহল দমন করতে না পেয়ে তিনি ভিক্ষুকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কেন ফুল দিচ্ছ। দেশের রাজা মরলে আবার নতুন রাজা আসবে, তোমাদের তো কোন অবস্থার পরিবর্তন হবে না।” 
তোমাদের কি স্বার্থ? ভিক্ষুকদের নেতা অত্যন্ত কান্না ভেজা গলায় বলল, “আরে সাহেব, আপনি কি বুঝবেন আমাদের কি ক্ষতি আর আমাদের বেদনা? আমরা ভিক্ষা করে খাই। কারোও কাছে আমাদের সম্মান নেই। আপনাদের কাছে হাত পাতলে কখনও কিছু দেন আর বেশীর ভাগ সময় তাচ্ছিল্য ভরে তাড়িয়ে দেন। যখন কিছু দেনও তখনও ভাল মনে দেন না। আমাদেরকে আপনারা মানুষ বলে গণ্য করেন না। কিন্তু এই লোকটা, [প্রেসিডেন্ট জিয়া] আমাদের মানুষের সম্মান দিতেন, আমাদেরকে মানুষ বলে মনে করতেন। উনি যখন গাড়িতে চড়ে বঙ্গভবনে যেতেন তখন তাদের সালামের জবাব দিতেন, তাদের দিকে হাত নাড়িয়ে যেতেন, আমরা তো তাঁর কাছ থেকে কোন দিন ভিক্ষা পাইনি কিন্তু মানুষ হিসাবে মর্যাদা পেয়েছি। এর বেশী আর কে কি পেতে পারে। তাই তাদের শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। আমরা কি দিতে পারি? মাত্র কয়েকটা ফুল দিয়ে গেলাম। ইচ্ছা হয়, আমাদের সমস্ত অন্তঃকরণ ওনার পায়ে রেখে যাই।”
এ ছিল এই বঞ্চিত, জনগণঘৃণীত একদল মানুষের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধাঞ্জলি। এর মূল্যের কি কোন পরিমাপ করা যায়? ক'জন রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে এই অমূল্য উপঢোকণ মেলে? সত্যি সাধারণ মানুষগুলোকে তিনি যে কত আপন করতে পেরেছিলেন সেটা ভাবতে আশ্চর্য্য লাগে।
তেমনি আমার সেই ১৯৭৬ সালে ১ নভেম্বর যশোর বিমান বন্দরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে আমার হাত নাড়ানো দেখে আমার সাথে হাত মিলানো, আর আমার পিঠ চাপড়ে ইয়ং ম্যান সম্বোধন আজও হৃদয়ে মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে।
শহীদ জিয়া আর নেই কিন্তু সত্যি কি তাই। আসলে জিয়া অমর,জিয়া মৃত্যুঞ্জীবি, জিয়া চির ভাস্বর, জিয়া বেচেঁ আছে তার দর্শনে তার কীর্ত্তিতে, তার মহত্বে। যতদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ বেঁচে থাকবে জিয়ার আর্দশ ,তার দর্শন,তার সততা, তার দেশপ্রেম আমাদের ভবিষ্যতের দিশারী ।
লেখক: মুহাম্মদ আবু তৈয়ব 
সাংবাদিক, এনটিভি খুলনা ব্যুরো প্রধান।
মোবাইল: ০১৭১১-২৯৬৬৮২/০১৭১১৩৩৫৮৮০
ইমেল: ntvkhulna @gmail.com

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ১ মাস আগে