খুলনা | শনিবার | ১৩ জুন ২০২৬ | ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আবির্ভাব ও জীবন বৃত্তান্ত

কৃষ্ণ গোপাল সেন |
১২:০১ এ.এম | ০৩ জুন ২০২৬


যুগ যুগ ধরে এই ধরার বুকেই আবির্ভূত হয়েছেন শ্রী  চৈতন্য, তৈলঙ্গস্বামী, যুগাবতার রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব,  বামাক্ষ্যাপা  পুরুষোত্তম বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী, স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, কৈলাসপতি, ব্রজবাসী, শঙ্করাচার্য প্রভৃতি মহাপুরুষ। তাঁদের মধ্যে  অনন্য আরেকটি নাম  একটি নাম লোকনাথ ব্রহ্মচারী।
পুণ্যময় এই ধরায় যখন সত্য ও ন্যায় অবহেলিত, মিথ্যা ও অন্যায়ের জয় জয়াকার, অরাজকতায় ও হতাশায় মানুষ যখন হাবুডুবু খাচ্ছে ঠিক তখনই হতাশাগ্রস্ত ভ্রান্ত মানুষকে আশার আলো এবং শান্তি ও সত্যের পথ দেখাতে আবির্ভূত হয়েছেন বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী। দ্বাপর যুগে শুভ জন্মাষ্টমীর পুণ্যলগ্নে ব্রাহ্মমুহূর্তে কমলা দেবীর কোল আলো করে আকাশ বাতাস মুখরিত করে অপূর্ব সুন্দর শিশু ব্রহ্মচারী জন্ম নিলেন ধরার বুকে। আনুমানিক ১১৩৭ সনে ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার কচুয়া গ্রামে রামকানাই ঘোষালের ঘরে জন্ম নিয়া এই শিশুর প্রবল ভগবান গাঙ্গুলী নামকরণ করলেন লোকনাথ পণ্ডিত। লোকনাথের পিতার ইচ্ছা ছিল তার পুত্রদের মধ্যে একজন সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করে ভগবানের নাম কীর্তন করে বংশের পবিত্রতা সম্পাদন করুক। স্থির হলো লোকনাথ সন্ন্যাসী হবেন। তাই পিতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ভগবান গাঙ্গুলীর নিকট পুত্রকে তুলে দিলেন। ভগবান গাঙ্গুলীর সিদ্ধান্ত মতে লোকনাথ, বাল্যসখা বেণীমাধব এবং তিনি গৃহত্যাগ করলেন। গৃহত্যাগ করে তারা কলকাতার কালীঘাটে এসে উপস্থিত হন। এখানে তখন জটাঝট ধারী বহু সন্ন্যাসী দূর দূরান্ত থেকে এসে উপস্থিত হতেন। সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে কিছুদিন কাটানোর পর তারা চলে যান গভীর অরণ্যে। গভীর এই অরণ্যে কঠোর ব্রহ্মচর্যব্রত পালন মনের মধ্য দিয়ে কেটে যায় ২০/২৫ বছর। এরপর দুর্গম হিমালয় পর্বতে দীর্ঘকাল সাধনা করার পর তারা এক যোগীপুরুষের সাক্ষাৎ লাভ করেন। ইনি হলেন হিতলাল মিশ্র। অতি বৃদ্ধ ভগবান গাঙ্গুলী এই মহাযোগীর হাতে লোকনাথ ও বেণীমাধবকে অর্পণ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যোগী হিতলালের কৃপায় লোকনাথও যোগসামর্থ্য অর্জন করেন। তারপর দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়ে লোকনাথ তার পরম প্রাপ্তি লাভ করেন এবং অপরিমেয় শক্তির অধিকারী হন। এরপর লোকনাথ ও বেণীমাধব হিমালয়ের পূর্বাঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে অবতরণ করে দুইজন দুইদিকে যাত্রা শুরু করলেন। বেণীমাধব বামাখ্যা আর লোকনাথ মহাপীঠ চন্দ্রনাথের পথে। লোকনাথ এদেশের পাহাড় পর্বতের বনাঞ্চলে অনেককাল বাস করার পর মেঘনার কাছে বারদীতে পদার্পণ করেন। বারদীতে তার আগমনে বিচিত্র ঘটনার জন্ম দিলো। নানা স্থানে বিচরণ করার পর সেদিন লোকনাথ ত্রিপুরার দাউদকান্দি গ্রামে আসেন। এক বৃক্ষতলে উলঙ্গ সন্ন্যাসী লোকনাথের চরণ ধরে এক ব্যক্তি কাঁদতে থাকে। ফৌজদারী মামলার আসামি হয়ে সে বড়ই বিপদে পড়েছে। সন্ন্যাসী কৃপা ভরে তাকে আশ্বাস দিলেন। বিপদ মুক্ত হয়ে সে লোকনাথ পা জড়িয়ে ধরল। তার অনুরোধে দয়ার্দ ব্রহ্মচারী লোকনাথ বারদীতে ভেস্তু কর্মকারের গৃহে বাস করতে লাগলেন। এরপর স্থানীয় জমিদার নাগবাবুদের উদ্যোগে বারদীতেই ব্রহ্মচারীর জন্য কুঠির নির্মিত হলো। পুণ্যার্থী নরনারী ব্রহ্মপুত্রে স্নান করতে গেলেই এ সন্ন্যাসীর চরণধূলি নেওয়ার জন্য আসতেন বারদীতে। জীবন ব্রহ্মপুত্র দৃশ্য লোকনাথ ব্রহ্মচারীকে দর্শন করে তারা কৃতার্থ বোধ করতেন। শতবর্ষ যোগ সাধনায় সিদ্ধ ব্রহ্মচারী গিরি চূড়া গহিন অরণ্য বাস ছেড়ে এবার লোকনাথ লোকালয়ে এসেছেন। উলঙ্গ সন্ন্যাসী কটিতে তুলে দিয়েছেন কৌপীন, দেহে ধারণ করেছেন উত্তরীয়ের আবরণ। বারদীর ক্ষুদ্র আশ্রমে এবার বৃহত্তম প্রকাশের পালা। ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত আচার্য বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী একদিন নৌকা যোগে দলবলে ব্রহ্মচারীর আশ্রমে এসে লোকনাথের বিস্ময়কর যোগশক্তি ও কৃপা বিতরণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছিলেন। ঢাকায় ফিরে বিজয় কৃষ্ণ বারদী ও ব্রহ্মচারীর মাহাত্ম্য ও যোগ শক্তির প্রভাব প্রচার করাতে লোকনাথের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
মুমূর্ষু ভক্তবৃন্দ ও রোগ শোক ক্লিষ্ট নরনারীরা ব্রহ্মচারীর কাছে এসে ভিড় জমাতে লাগলো। ব্রহ্মচারীর কৃপা পেয়ে একবার চাঁদপুরের কয়েকজন আইনজীবী আদালত বন্ধ উপলক্ষে আশ্রমে থাকার পর তারা বিদায় গ্রহণের জন্য ব্রহ্মচারীর অনুমতি চাইলেন। ব্রহ্মচারী বাবা একজনকে নির্দেশ করে বললেন-যদি তোমাদের যেতে হয় তবে ওঁকে রেখে যা। উকিলগণ এই বাক্যের তাৎপর্য বুঝতে না পেরে একজন উকিলকে রেখে চলে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে রেখে যাওয়া উকিল অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অলৌকিক শক্তির প্রভাবে উকিল সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। যখন বাংলাদেশে আইন শৃঙ্খলা কঠোর হতে সংরক্ষিত হচ্ছিল ঠিক সেই সময় নারায়ণঞ্জ মহকুমার হাকিমের কোর্টে এক জটিল ফৌজদারী মামলার সাক্ষী দিতে গিয়ে ব্রহ্মচারী আর এক অলৌকিক শক্তির পরিচয় দিলেন। বারদী গ্রাম নিবাসী কালীকান্ত নাগ মহাশয়ের পুত্র রাধাকান্ত নাগ একদিন অতিরিক্ত মদ্যপানে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ব্রহ্মচারীর আশ্রমে গিয়ে তাকে অপমান করার চেষ্টা করেন। তখন ব্রহ্মচারীর এক পশ্চিম দেশীয় ভক্ত রাধাকান্তকে বলপূর্বক বাবার ঘর থেকে বের করে দেয়। এতে রাধাকান্ত ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে সর্দার নিয়ে এসে ঐ ব্যক্তিকে মারতে মারতে বাড়ি নিয়ে যায়। ছাড়া পেয়ে তিনি ফৌজদারী মামলা দায়ের করেন। রাধাকান্ত নাগের লোকেরা যে ব্রহ্মচারীর শিষ্যকে মারতে মারতে নিয়ে গেছে এই দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ব্রহ্মচারী নিজেই। আদালতে কৌতূহলী জনতার মধ্যে ব্রহ্মচারী বাবাকে প্রশ্ন করা হলো তার বয়স কত? তিনি উত্তরে বললেন তা প্রায় ১৫০ বছর। অপর পক্ষের মোক্তার চিৎকার করে বললেন, দেখুন সাধু বাবা এটা কিন্তু আদালত। এখানে ওধরনের অসম্ভব কথাবার্তা বলা চলে না। ব্রহ্মচারী শান্তভাবে বললেন তবে তোমাদের যা ইচ্ছে হয় লিখে নাও। বিপক্ষের মোক্তার জেরার মধ্য দিয়ে প্রতিপন্ন করতে চান ব্রহ্মচারীর পক্ষে ঘটনাটি দেখা মোটেই সম্ভব নয়। পুনরায় ব্রহ্মচারীকে জেরা করলে তিনি দূরেই একটি গাছের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “আচ্ছা দেখতো ঐ গাছে কোন প্রাণী আরোহণ করছে কি-না?” সেদিকে তাকিয়ে সবাই স্বীকার করলেন যে তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। ব্রহ্মচারী কৌতুক ভরা হাসি হেসে বললেন, তোমাদের বয়স কম, দৃষ্টিশক্তি বেশী অথচ কিছুই নজরে পড়ছে না। আমি দেখছি সারি সারি লাল পিঁপড়ে গাছটার গা বেয়ে উঠে যাচ্ছে। আদালতের কৌতূহলী জনতা এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলো।
লোকনাথ ছিলেন অপার করুণাসিন্ধু। তার কাছে ভক্ত অভক্তের প্রভেদ ছিল না। যে বিপদে পড়ে তার সাহায্য কামনা করে ব্রহ্মচারী তাকেই কৃপা করে গেছেন। খুনের মোকদ্দমায় নিবারণ রায়ের ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। জেলখানা থেকে তিনি লোকনাথ ব্রহ্মচারীর নাম স্মরণ করে আকুল প্রাণে তার কৃপাপ্রার্থী হয়েছিলেন। যেদিন কলকাতা হাইকোর্টে তার আপীল শুনানি হয় সেদিন তিনি জেলের মধ্যে উন্মাদের মত হয়ে উঠেছিলেন। আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকায় তার প্রাণ ছটফট করছিল। তখন তিনি সবিনয়ে দেখলেন এক জটাধারী দীর্ঘকায় মহাপুরুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে। ভীতচিত্তে নিবারণ জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কে? মহাপুরুষ উত্তরান দিয়ে বললেন-আমি তোর মোকদ্দমার রায় লিখিয়ে দিয়ে এলাম, তুই খালাস হয়েছিস। তখন নিবারণ আবেগ কম্পিত কণ্ঠে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কে? আমাকে চিনলি না, আমি বারদীর ব্রহ্মচারী-এই বলে মহাপুরুষ অন্তর্হিত হলেন। নিবারণ খালাস পেয়ে বারদী আশ্রমে এসে লোকনাথের তৈল চিত্র যখন বুঝতে পারলেন তার এই ধরায় কার্য শেষ হয়েছে তখন দিনক্ষণ ধার্য করা হলো। যথাসময়ে তিনি অনির্বাণে গমন করলেন। সেদিন ছিল ১২৯৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ। বেলা ১১ টা ৪৫ মিনিটে বাবার অবিনাশী সূ² দেহী আত্মা, তার রক্ত মাংশে গড়া নশ্বর, পঞ্চভৌতিক দেহটা পঞ্চভূতে জীবনের সমাপ্তি হয়। আজ  তার পার্থিব স্থূল শরীরে আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তার কোটি কোটি ভক্ত হৃদয়ে চির জাগ্রত হয়ে আছেন।
“রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে তখনই আমাকে স্মরণ করিও, আমি রক্ষা করিব।”

প্রিন্ট

আরও সংবাদ