খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৪ জুন ২০২৬ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মাকে অবহেলার অভিযোগে মোংলা বন্দরের যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান বরখাস্ত

মোংলা প্রতিনিধি |
১১:১০ পি.এম | ০৩ জুন ২০২৬


নিজ গর্ভধারিনী মায়ের প্রতি অবহেলার কারণে মোংলা সমুদ্র বন্দরের পদায়নকৃত (সদস্য হারবার এনড মেরিন) যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্র“ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। 
বুধবার মোংলা বন্দর থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর ঢাকা মিরপুরের একটি বাসায় ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় মায়ের প্রতি অবহেলার অভিযোগ তুলে ছেলে যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে (সংযুক্ত) না হলে একই দিন বিকেলে তাৎক্ষণিক তাকে অবমুক্ত (স্টান্ড রিলিজ) বলে কঠোর ব্যবস্থা নিবে সরকার। 
জানা যায়, রাজধানীর ঢাকা মিরপুর এলাকার একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহাজান বেগম নামে এ বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে ওই বৃদ্ধা প্রায় ৭ থেকে ৮ দিন আগে মারা যায় এবং তার শরীরে পচন ধরেছে। উদ্ধার করা মৃত নূরজাহান বেগমের উচ্চ শিক্ষিত তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। 
এক তথ্যে জানা গেছে, নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড. একে এম আনিসুর রহমান বর্তমানে মোংলা বন্দরে (সদস্য হারবার এন্ড মেরিন)-(যুগ্ম-সচিব) পদে কর্মরত। তিনি ১৯৮৬ সালে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৮৮ সালে ঢাকা কলেজ হতে এইচএসসি পাস করেন (প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ)। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক করেন (প্রথম বিভাগ, ১৯৯৫ সাল)। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন দফতরে তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। 
যুগ্ম-সচিব পদের এই কর্মকর্তার মা সম্পূর্ণ অবহেলিত ভাবে মারা গেলেও, তিনি নিজে এক সময় সরকারি একটি ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ হাসপাতাল প্রকল্পের উপ-পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই স্কুল অফ পাবলিক পলিসি এন্ড ম্যানেজম্যান্ট হতে এমপিপি ও পিএইচডি লাভ করেছিলেন মাকে অবহেলা করা এই বড় মাপের কর্মকর্তা। 
নূরজাহান বেগমের দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন অধ্যাপক ও বেসরকারি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির এ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি। তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ৩২ ব্যাচের একজন প্রাক্তন ক্যাডেট, এসএসসি (১৯৮৯), এইচএসসি (১৯৯১) তে সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি ও ২০০১ সালে এমএসসি সম্পন্ন করেন। তার রয়েছে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রিও। 
নূরজাহান বেগমের কন্যা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা, যিনি মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা, আরেক ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। এছাড়া মৃত নূরজাহানের আরো বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন সংস্থা থেকেও। মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত হলেই যে কেউ প্রকৃত মানুষ হতে পারেনা, এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের সমাজকে তা বুঝিয়ে দিলো মৃত নূরজাহান। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের বরাত দিয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর একটি বাসা থেকে নূরজাহান বেগম নামের বৃদ্ধার পচা-গলা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার বয়স আনুমানিক ৭৫ বছর। বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় মেয়ের বাসার একটি কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করে আসছিলেন তিনি। রবিবার (১ জুন) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল পেয়ে পল­বী ৬ নম্বর সেকশনের ৮ নম্বর সড়কের ওই বাসা থেকে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। বাসাটি ওই বৃদ্ধার মেয়ের। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, যিনি বছর পাঁচেক আগে মারা গেছেন। মৃতের এক ছেলে যুগ্ম-সচিব এবং আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের শিক্ষক। তারা পরিবারসহ অন্যত্র থাকতেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও বুয়েটের শিক্ষক সন্তান এলেও মোংলা বন্দরে কর্মরত এই যুগ্ম-সচিব পদ মর্যাদা সম্পন্ন বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান যাননি। তাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে মোংলা বন্দর চেয়ারম্যানসহ বন্দরের অন্যান্য কর্মকর্তাগণ মহাখুশী। সরকার যদি প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেণ, তবে সমাজ থেকে কোন মা-বাবা অযতœ আর অবহেলায় মৃত্যুবরণ করবেন না।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ