খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৪ জুন ২০২৬ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

গেজেটভুক্ত হলেও নেওয়া হয়নি সংরক্ষণের উদ্যোগ

ঝিনাইদহে অযত্ন-অবহেলায় অস্তিত্ব সংকটে ২১ প্রত্নতত্ত্ব স্থাপনা

খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ |
১১:৫৪ পি.এম | ০৩ জুন ২০২৬


ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ জনপদ ঝিনাইদহ। অঞ্চলটির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন। বারোবাজারের প্রাচীন মসজিদ, নলডাঙ্গা রাজবাড়ী, ঢোল সমুদ্র দীঘি, গাজী-কালু-চম্পাবতী মাজার, কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র ও গণিতবিদ কেপি বসুর বসতভিটাসহ শতাব্দী প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে এ জেলায়। জেলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ২১টি প্রতœতাত্তি¡ক স্থাপনাকে গেজেটভুক্ত করেছে প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর। তবে সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে এসব স্থাপনা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রতœতত্ত¡বিদরা বলছেন, প্রাচীন ও ঐতিহাসিক এসব স্থাপনা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় অমূল্য এসব স্থাপনার গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খুঁজতে হবে কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায়।
ভারত সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার খালিশপুরে রয়েছে উনিশ শতকে নির্মিত প্রাচীন নীলকুঠি ভবন। যা একসময় ঔপনিবেশিক শাসনের সাক্ষী। স্থাপনাটি ২০১২ সালের ১৪ জুন প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত হলেও বাস্তবে রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দক্ষিণমুখী ভবনটির দৈর্ঘ্য ১২০ ফুট, প্রস্থ ৪০ ফুট ও উচ্চতা ৩০ ফুট। দক্ষিণ দিকে প্রশস্ত বারান্দা। এটি ১২টি কক্ষবিশিষ্ট দ্বিতল ভবন। গোসল করার জন্য পাকা সিঁড়ি কপোতাক্ষ নদের তীর পর্যন্ত নামানো। নীলকুঠিতে রয়েছে একটি আমবাগান। নীলকুঠির পাশেই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মহাবিদ্যালয় ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর। বর্তমানে কুঠিরটি জরাজীর্ণ। চুন-সুড়কি, ইট ও টালির তৈরি স্থাপনাটির ছাদ বেয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। দেয়ালে ধরেছে শ্যাওলা ও বড় ফাটল। সংস্কারের অভাবে কুঠিবাড়িটি এখন ধক্ষংসের দ্বারপ্রান্তে।
মহেশপুর উপজেলার বাসিন্দা নাসির উদ্দীন বলেন, ‘তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কার্যত থেমে যায়। কোনো কোনো স্থাপনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতাও তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসন, প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর ও ভ‚মি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরুই হয়নি।’
কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারকে অনেকে বারো আউলিয়ার শহর বলে থাকেন। ইসলাম প্রচারের জন্য আউলিয়ারা এসেছিলেন এ জনপদে। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখানে আছে পুরনো শহর মোহম্মদাবাদ। ১৯৯৩ সালে মাটি খুঁড়ে সন্ধান মেলে নয়টি প্রাচীন মসজিদের। এসব মসজিদ ৭০০ বছরেরও বেশি পুরনো। ধারণা করা হয়, মাটির নিচে আরো কিছু মসজিদ রয়েছে। তবে এসব পুরাকীর্তির মধ্যে গোড়ার মসজিদ ও দরসবাড়ি মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ওসমান গণি জুয়েল বলেন, ‘ঐতিহাসিক মসজিদগুলো সংরক্ষণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। এগুলো দিন দিন ধক্ষংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে প্রশাসন দৃষ্টি না দিলে পর্যায়ক্রমে এসব স্থাপনা বিলীন হয়ে যাবে।’
ইতিহাসবিদরা জানান, তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্র ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা নগেন্দন্রাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার এ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল। চাকরিসূত্রে তিনি সে সময় কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। ইলা মিত্রের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায় হলেও তার পৈতৃক বাড়ি শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের বাগুটিয়া গ্রামে। উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে ১৩ কিলোমিটার দূরে দোতলা বাড়িটি এখন অন্যদের দখলে রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বাড়িটিরও বেহাল অবস্থা। ভেঙে ফেলা হচ্ছে ইটের গাঁথুনি ও ভিতগুলো। কারুকাজখচিত বাড়িটির জানালা-দরজাসহ দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। তবে এটি সংরক্ষণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি তেমন কোনো উদ্যোগ।
ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব বলেন, ‘এসব স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার, নিয়মিত তদারকি ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন। শুধু গেজেটভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অযতেœ পড়ে থাকলে একসময় এগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মুরারীদহ গ্রামের নবগঙ্গা নদীর তীরে রয়েছে মিয়ার দালান। ১২২৯ বঙ্গাব্দে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন তৎকালীন জমিদার সলিমুল­াহ চৌধুরী। ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১২৩৬ বঙ্গাব্দে। সলিমুল­াহ চৌধুরী স্থানীয়দের কাছে মিয়া সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। এজন্য বাড়িটি মিয়ার দালান বলে পরিচিতি পায়।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৭ সালে ভবনটি বিক্রি করা হয় সেলিম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির কাছে। তাই ভবনটিকে স্থানীয়ভাবে কেউ কেউ সেলিম চৌধুরীর বাড়ি বলেও জানে। সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ২০০ বছর আগে নির্মিত স্থাপনাটি।
সদর উপজেলার হরিশংকরপুর গ্রামে অবস্থিত গণিতবিদ কালীপদ (কেপি) বসুর বাড়িটিও অযতœ আর অবহেলায় ধক্ষংসের দ্বারপ্রান্তে। ১৯০৭ সালে নবগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে নয় বিঘা জমির ওপর বাড়িটি নির্মাণ করেন কেপি বসু। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, ‘কেপি বসুর বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উলে­খযোগ্য কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এটি দর্শনীয় স্থান হওয়া সত্তে¡ও সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছয়টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত ২১টি ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্তি¡ক স্থাপনা তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে কাগজে-কলমে এসব স্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ স্থাপনা সংরক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
প্রতœতাত্তি¡করা বলছেন, শুধু গেজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত জরিপ, সংস্কার পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ঝিনাইদহ তার মূল্যবান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হারাতে পারে। এসব হেরিটেজ স্থাপনা শুধু অতীতের নিদর্শন নয়, এগুলো স্থানীয় পরিচয়, ইতিহাস ও সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো আজ নিঃশব্দে ধক্ষংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ঝিনাইদহে প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় নেই। এসব স্থাপনার দেখভাল করে জেলা প্রশাসন। সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ নোমান হোসেন বলেন, ‘হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ