খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৪ জুন ২০২৬ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

দল ভেঙে চুরমার, তৃণমূল কংগ্রেসের সব সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্ত

খবর প্রতিবেদন |
০১:২৫ এ.এম | ০৪ জুন ২০২৬


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে গড়া দল তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্র মডেলে জোট বেঁধেছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী বিধায়কেরা। কয়েকদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জন্ম নিয়েছে মমতা-হীন ‘আসল তৃণমূল’।
মমতার সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৫৮ বিদ্রোহী বিধায়কের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহী বিধায়কদের এমন কাণ্ডে বেসামাল মমতা দলের সব কমিটি ভেঙে দিয়েছেন।
অঙ্কের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হতে গেলে ৩০ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। ঋতব্রতর পক্ষে রয়েছেন ৫৯ জনের বেশি তৃণমূল বিধায়ক। তাই তারা ঋতব্রতকেই বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে চিঠি জমা দিয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দলের নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটে হেরে যাওয়ার পর তৃণমূলের পক্ষ থেকে বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। এরপর তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে বিধায়কদের স্বাক্ষর করা একটি দলীয় রেজিলিউশনের চিঠি দেয়া হয় বিধানসভায়। সেখানে বিষয়টি জানানো হয় এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন করা হয়।
কিন্তু সেই চিঠিতে বিধায়কদের স্বাক্ষর জালের অভিযোগ ওঠে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। তদন্ত শুরু করে সিআইডি। একাধিক বিধায়কের বাড়িতে যান তদন্তকারীরা। নোটিশ দেয়া হয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, স্বাক্ষর জালের বিষয়টি সামনে এনেছেন তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। তারপরই তৃণমূলের পক্ষ থেকে ওই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করা হয়।
এরপরেই তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী শিবিরের আগুন কার্যত জ্বলে ওঠে। গত ৩১ মে মমতার কালীঘাটের বাড়িতে বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছিল। ৮০ তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে হাজির হয়েছিলেন মেরে কেটে ১৭ জন! তখন বৈঠকই ভেস্তে যায়। অন্যদিকে সেদিনই বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক কলকাতার একটি বিলাসবহুল হোটেলে ৫০ জন বিদ্রোহী বিধায়ককে নিয়ে বৈঠক করে বলে জানা যায়। তখনই দল ভেঙে যাওয়ার স্পষ্ট আভাস মিলেছিল।
এরপর বুধবার বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কেরা সশরীরে তাদের স্বাক্ষরিত চিঠি বিধানসভার স্পিকারের হাতে তুলে দিয়ে জানিয়ে দেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা হিসাবে নির্বাচিত করছেন। জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, শিউলি সাহাকে ডেপুটি লিডার হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। আর আখরুজ্জামানকে বেছে নেয়া হয়েছে বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক হিসেবে। সেখানে উল্লেখযোগ্য ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই তাদের নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 
তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলো মমতা : দলীয় সংকট ও বিদ্রোহের আবহে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে দলকে নতুন ভাবে সাজাতে সর্বস্তরে আত্মসমালোচনা, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সব কমিটি এবং সহযোগী ও শাখা সংগঠনের সব কমিটি অবিলম্বে বিলুপ্ত করা হচ্ছে। পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করা হবে।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে নেওয়া হলো, যখন দলের একাংশের বিধায়ক প্রকাশ্যেই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিদ্রোহী বিধায়কদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বিধানসভার স্পিকারের কাছে পৃথক পরিষদীয় দল হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন করেছে। ফলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। 
গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। একাধিক নেতা ও বিধায়ক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, প্রার্থী বাছাই এবং নির্বাচনী কৌশল নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটে বুধবারের সিদ্ধান্তকে অনেকেই দলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখছেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, আগামী দিনে জেলা থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত সব সংগঠন নতুন ভাবে গড়ে তোলা হবে। কারা মাঠে সক্রিয় ছিলেন, কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং কোথায় কোথায় সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র সাংগঠনিক রদবদল নয়। বরং ক্ষমতা হারানোর পর দলকে নতুনভাবে পুনর্গঠনের একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা। একই সঙ্গে বিদ্রোহী শিবিরকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তৃণমূলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টাও এর মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতেও কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দলকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তবে এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। 
কারণ একদিকে নির্বাচনী পরাজয়, অন্যদিকে বিধায়কদের বিদ্রোহ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য নতুন উদ্যমে সংগঠনকে প্রস্তুত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। 
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের স‚চনা হলো। এখন নজর থাকবে, পুনর্গঠনের পর তৃণমূল কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে নেতৃত্বের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
প্রসঙ্গত, তৃণমূল এবারের ভোটে ৮০টি আসনে জিতেছে। দলত্যাগ বিরোধী আইন এতাতে গেলে ঋতব্রতদের অন্তত ৫৩ জন বিধায়কের প্রয়োজন ছিল। বুধবার সকালে দেখা যায়, বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। এদিন বিধানসভায় যে বৈঠকে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেয়া হয়, সেখানে ৫৯ জন বিধায়কের স্বাক্ষর রয়েছে। স্পিকারের কাছে যে চিঠি তারা জমা দিয়েছেন, সেখানে জানানো হয়েছে যে আরও ছয়জন পরে স্বাক্ষর করবেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ