খুলনা | রবিবার | ০৭ জুন ২০২৬ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

একটি নিঃসঙ্গ মৃত্যুর গল্প : আমাদের সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
১২:০০ এ.এম | ০৬ জুন ২০২৬


সা¤প্রতিক সময়ে নুরজাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা সমগ্র দেশকে নাড়া দিয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে তিনি ছিলেন একা, অসহায় ও নিঃসঙ্গ। মৃত্যুর পরও কয়েক দিন তাঁর খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। অবশেষে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সংবাদটি পড়ে অনেকেই কেঁদেছেন, অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন, আবার কেউ কেউ নিজেদের জীবন ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন।
আসলে এটি শুধু একজন মায়ের মৃত্যুর গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের একটি কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ এবং আত্মকেন্দ্রিক জীবনধারার কারণে আমরা ধীরে ধীরে আমাদের সবচেয়ে আপন মানুষদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। অথচ পৃথিবীতে মাতা-পিতার চেয়ে আপনজন আর কেউ নেই।
মহান আল্লাহ সমগ্র বিশ্বের একমাত্র উপাস্য ও অভিভাবক। আর মাতা-পিতা হলেন সন্তানের পার্থিব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়। একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেন, অসংখ্য কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। একজন বাবা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তাদের ত্যাগ, ভালোবাসা ও স্নেহের ঋণ কোনো সন্তান কখনো পরিশোধ করতে পারে না।
এ কারণেই ইসলাম মাতা-পিতার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাঁর নিজের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, ধমক দিও না; বরং সম্মান ও নম্রতার সঙ্গে কথা বলো।”
বিশেষভাবে বার্ধক্যের সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ বৃদ্ধ বয়সে মানুষ অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়, একই কথা বারবার বলেন বা অযৌক্তিক আচরণ করতে পারেন। তখন সন্তানদের ধৈর্য, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।
এ প্রসঙ্গে একটি শিক্ষণীয় ঘটনার কথা স্মরণ করা যায়। এক বৃদ্ধ পিতা তাঁর ছেলেকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “বাবা, এটা কী?” দেয়ালে বসা একটি কাকের দিকে ইঙ্গিত করে ছেলে কয়েকবার উত্তর দেওয়ার পর বিরক্ত হয়ে গেল। তখন পিতা একটি পুরনো ডায়েরি বের করে দেখালেন। সেখানে লেখা ছিল, ছোটবেলায় তাঁর ছেলে একই প্রশ্ন পঁয়ত্রিশবার করেছিলÑ“আব্বা, এটা কী?” আর তিনি প্রতিবারই হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন, “বাবা, এটা একটি কাক।” সন্তান যখন ছোট ছিল, তখন তার বারবার প্রশ্ন করতে ভালো লাগত; কিন্তু আজ বৃদ্ধ পিতার একই আচরণ সন্তানের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই গল্পটি হয়তো বাস্তব, হয়তো উপকথা। কিন্তু এর শিক্ষা বাস্তবের চেয়েও বড়। আজ আমরা অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি ঠিক সেই ধৈর্য ও ভালোবাসা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি, যা তারা আমাদের জন্য দেখিয়েছিলেন।
পবিত্র কুরআনে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনাও আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। তাঁর পিতা মূর্তিপূজারী ছিলেন এবং ইব্রাহিম (আ.)-কে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেছিলেন। এমনকি তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার হুমকিও দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও ইব্রাহিম (আ.) পিতার প্রতি সম্মান বজায় রেখেছিলেন এবং বলেছিলেন, “আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আমার প্রতিপালকের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।”
যদি একজন নবী এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারেন, তবে আমাদেরও উচিত মা-বাবার সঙ্গে সর্বোচ্চ সৌজন্য ও ভালোবাসার আচরণ করা।
নুরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছেÑআমরা কি আমাদের মা-বাবার যথাযথ খোঁজ নিচ্ছি? আমরা কি তাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি? আমরা কি তাদের একাকীত্ব অনুভব করছি? নাকি আমরা শুধু অর্থ, পদমর্যাদা ও ব্যস্ততার অজুহাতে তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?
মনে রাখতে হবে, একদিন আমরাও বৃদ্ধ হব। আজ আমরা যেভাবে আমাদের মা-বাবার সঙ্গে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্ম আমাদের সঙ্গেও ঠিক তেমন আচরণ করবে। তাই এখনও সময় আছে নিজেদের সংশোধন করার। বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াই, তাদের খোঁজ নিই, তাদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের মুখে হাসি ফোটাই। কারণ তাদের সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মাতা-পিতার যথাযথ হক আদায় করার, তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করার এবং তাদের দোয়া অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন। 
লেখক: বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ