খুলনা | সোমবার | ০৮ জুন ২০২৬ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

‘দফায় দফায় বেড়েছে কাজের সময়সীমা ও অর্থ বরাদ্দ’ # সড়কের কোথাও হয়নি কার্পেটিংয়ের কাজ তবুও এর বিল পরিশোধ

কেটে গেল ১৪ বছর তবুও শেষ হয়নি শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ, বেড়েছে জনদুর্ভোগ

আল মাহমুদ প্রিন্স |
০১:২১ এ.এম | ০৮ জুন ২০২৬


১৪ বছরেও শেষ হয়নি ব্যস্ততম খুলনার শিপইয়ার্ড সড়কের প্রশস্তকরণ কাজ। খুলনা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সড়কটি ১৪ বছর ধরে নগরবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনা শহরের এটি প্রবেশদ্বার হওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ চলাচলের মাধ্যম সড়কটি। শুকনো মৌসুমে ধুলো-বালি ঝড় আর বর্ষা মৌসুমে কাঁদা-মাটির কবলে পড়ে চরম ভোগান্তিতিতে পার করছে নগরবাসী। মাহবুব ব্রাদার্স ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজসে কেডিএ’র প্রকল্প কর্মকর্তাসহ কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই ভোগান্তির নেপথ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে সুকৌশলে মাহবুব ব্রাদার্স কাজের অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করে নিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে জুলাই বিপ্লবের পর ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলো। যদিও পরবর্তীতে মাহবুব ব্রাদার্সাকে জরিমানা এবং কার্যাদেশও বাতিল করে কেডিএ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রকল্পটি নতুন করে শেষ করতে আবারও সংশোধনী এনে পুনরায় পঞ্চমবারের মত একনেকে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যা পূর্বের ব্যয় থেকে বর্তমান ব্যয় প্রায় ২০০% বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 
প্রকল্পটি ৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পটি ২০১২ সালে গ্রহণ করা হয়। তখন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৮ দশমিক ৯০ কোটি টাকা। যা গত ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির সমাপ্তকাল ছিল ২০১৪ সালের ৩০ জুন। কিন্তু কোন কারণ ছাড়া পুনঃবিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারি অর্থ তসরুপ করার জন্য ৩০% ব্যয় বৃদ্ধি করে পুনরায় ১২৬ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা ব্যয় প্রক্কলিত ব্যয়ে দ্বিতীয়বার একনেক সভায় অনুমোদন করানো হয়। পাশাপাশি প্রকল্প সমাপ্তির জন্য সময় বৃদ্ধি করে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তৃতীয়বারের একনেক সভায় ১০০% ব্যয় বৃদ্ধি করে ২৫৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত মূল্যে প্রকল্পটির অনুমোদন গ্রহণ করা হয়। কথিত আছে এই বৃদ্ধিকৃত (২৫৯-১২৬)-১৩৩ কোটি টাকা প্রকল্প পরিচালক আরমান হোসেনসহ কেডিএ’র কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তৎকালীণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্সের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়। যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
প্রকল্পটি অনুমোদনের পর আতাউর রহমান লিমিটেড এবং মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডকে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ঠিকাদার কার্যাদেশ প্রাপ্তির পর কাজ শুরু করে। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় পুণরায় আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিগত ২০২৪ সালের ২১ মে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চতুর্থবারের মত মাত্র ৫ কোটি টাকা কমিয়ে ২৫৪ কোটি টাকায় অনুমোদন নেওয়া হয় এবং পাশাপশি চতর্থবারের মত ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়। আলোচ্য বিষয়ের ছিল ২৫৪ কোটি টাকার মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে ৯৯ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট ১৫৫ কোটি টাকা ভৌত নির্মাণ কাজের ব্যয় ধরা হয়। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স এরইমধ্যে মোটা কাজ শেষ না করে ১৫৫ কোটি টাকার কার্যাদেশের ৭০ দশমিক ৩৬ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করে নিয়ে যায়। 
সূত্রে জানা গেছে, সুকৌশলে চুক্তি বাতিলকৃত ঠিকাদারকে পরিশোধকৃত বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত বিল (কাজ না করা সত্তে¡ও) বর্তমানে একনেকে উপস্থাপনকৃত প্রকল্প ব্যয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া ১৫৫ কোটি টাকার ভৌত নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় ৫০% অর্থাৎ, ৭৫ কোটি টাকা ব্যয় করার পর প্রকল্প ব্যয় ১২২ কোটি টাকায় উত্তীর্ণ করে অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপনের বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলেও এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখার জন্য দুদক প্রধান কার্যালয় খুলনা অফিসকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। সেই হিসেবে দুদক অফিস খুলনা সরেজমিনে শিপইয়ার্ড রোড প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় পরিমাপ গ্রহণ করে। খুলনাস্থ দুদক অফিসের তদন্তে উদঘাটিত হয় যে, প্রকল্পের অনেক ধরণের কাজ না করা সত্তে¡ও বিপুল পরিমাণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। যেমন সম্পূর্ণ সড়কের কোথাও কার্পেটিং কাজ করা হয়নি। কিন্তু তদন্ত সত্তে¡ও কার্পেটিং-এর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এরূপ আরো কিছু কাজ না হওয়া সত্তে¡ও চুক্তি বাতিলকৃত ঠিকাদার মাহাবুব ব্রাদার্সকে সেসব কাজের উপর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। 
কেডিএ চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহাংগীর হোসেন (পিএসসি) বলেন, এ প্রকল্পের অর্থ বাড়তি ব্যয় করার কোন সুযোগ নেই। যখন একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তখন প্রাক্কলন ব্যয় হিসাব করে একনেকে উত্থাপন করা হয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদি এ কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেই ক্ষেত্রে খুলনা সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপদ দপ্তর দিয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেতে পারে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ