খুলনা | সোমবার | ০৮ জুন ২০২৬ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

‘সাগর-রুনি, মুনিয়া ও ত্বকী হত্যা মামলার অগ্রগতি নেই’

সরকারের ১০০ দিনে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের ১১৮৫ ঘটনা : টিআইবি

খবর প্রতিবেদন |
০১:৫১ এ.এম | ০৮ জুন ২০২৬


সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। আলোচিত সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা এবং মুনিয়া ও ত্বকী হত্যার বিচারে এণ বছরেও নেই কোনো আশানুরূপ অগ্রগতি।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইড্যাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি। এ সময় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সরকারের ১০০ দিনে অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই ও ৯০টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। 
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া, চুরির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২১৪টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ৩ হাজার ৪৯৬টি। আলোচিত দুই মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জন। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন, গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন, কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১৪ থেকে ১৮ জন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে আহত হয়েছে ৫ জন, বিচারবহির্ভ‚ত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে ১ জন, ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত ও অবমাননা অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে ৭ জন এবং দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে তিনটি।
সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলকারনাইন। প্রতিবেদনের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের অংশে বলা হয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ক্রমবর্ধমান ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
এ ছাড়া, কিশোর গ্যাংয়ের অব্যাহত তৎপরতার ক্ষেত্রে ঢাকায় সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িতদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা লক্ষণীয়। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বিভিন্ন স্থানে মাজার এবং ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর এবং একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা, কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং ক্ষমতাসীন দলের এক নেতাকে নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার জেরে একজনকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে।
তবে সরকারের ১০০ দিনে অপরাধ প্রতিরোধে কিছু উদ্যোগ বা পদক্ষেপের কথাও উঠে এসেছে। তার মধ্যে রয়েছে সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ঘোষণা করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা। পর্যায়ক্রমে মাঠ থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার শুরু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরি পুলিশ বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত এবং মব ভায়োলেন্স প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা এসেছে।
প্রতিবেদনে বিচার বিভাগ : বিচারিক কার্যক্রম অংশে বলা হয়েছে, বিতর্কিত কর্মকান্ডের অভিযোগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে আইসিটির প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ, মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে আসামিকে মৃত্যুদÐ প্রদান ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার রায় ঘোষণা, সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকান্ডের দশ বছর পর মামলায় অগ্রগতি; একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেফতার করা হয়েছে।অন্যদিকে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা করা, মামলা প্রত্যাহার বা জামিন দেওয়ার চর্চা অব্যাহত রয়েছে; ভিন্নমতের মানুষের বিচারের ক্ষেত্রে এখনও পুরোনো সংস্কৃতি বিদ্যমান, একদিকে দ্রুততার সঙ্গে সরকারি দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, অন্যদিকে সাংবাদিকসহ ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের এবং বারবার জামিন স্থগিত এবং সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, মুনিয়া ও ত্বকী হত্যার বিচারে জনমনে প্রত্যাশার সৃষ্টি হলেও এসব মামলায় কোনো অগ্রগতি নেই।
কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান পুরোনো ধারা : বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন হয়েছে। এর মধ্যে নতুন সরকার কিছু ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ধারাই রয়ে গেছে।
নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আমরা ভালো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি। আবার কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ধারা দেখতে পাচ্ছি। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে এমন কিছু আইন তৈরি করা হয়েছে। সরকার গঠনের পর এমন কিছু নিয়োগ হয়েছে যেগুলো স্পষ্টত দলীয়করণ। এটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত, সরকার এগুলো পরিহার করতে পারত।
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে টিআইবি জানিয়েছে, সরকার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি দিলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জবাবদিহিতামূলক শাসন প্রতিষ্ঠায় সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।
টিআইবি জানিয়েছে, সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখারও অভাব রয়েছে। ফলে সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
সংস্থাটি সংস্কার কার্যক্রমে আরও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বলেও তাদের সার্বিক পর্যালোচনায় বলা হয়।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ থাকলেও পরিবহন, বাজার ও ব্যবসা খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। এমনকি একজন মন্ত্রীকে চাঁদাবাজির বৈধতা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়াও জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণআন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি সুশাসিু, জবাবদিহিতামূলক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই প্রত্যাশা সামনে রেখে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হলেও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের মতো নানা চ্যালেঞ্জ সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নাজুক ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট ও অরাজকতার ঘটনা অব্যাহত ছিল। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অপরাধের ঘটনা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে টিআইবি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভ‚মিকা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহŸান জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ