খুলনা | বুধবার | ১০ জুন ২০২৬ | ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিচারিক ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন ন্যায়বিচারের এই গতি অব্যাহত থাকুক

|
১২:২১ এ.এম | ১০ জুন ২০২৬


রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে রোববার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। আমাদের বিচারিক ইতিহাসে এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রায়ে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ এবং সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ন্যায়বিচারের আশ্বাসের পর ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আদালত এ মামলার রায় দিলেন। নিম্ন আদালতে দ্রুততম সময়ে রায় প্রদানের এ অসামান্য গতি যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক।
আদালতের পর্যবেক্ষণে যথার্থই বলা হয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন এমন জঘন্য যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে আহত করে এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এ মামলায় তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনালের সমন্বিত পেশাদারত্ব, নিখুঁত গাঁথুনি এবং আন্তরিকতা আমাদের আস্থার জায়গাটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। তবে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে রায় প্রদানের এ ঐতিহাসিক মাইলফলক যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আগের বহু আলোচিত মামলার মতো এ রায় কার্যকরেও এখনো দীর্ঘ সাংবিধানিক ও বিচারিক পথ বাকি রয়েছে।
বিগত সময়ে আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখেছি, অনেক জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত দ্রুত রায় দিলেও উচ্চ আদালতে এসে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের জট এবং দীর্ঘসূত্রতায় সেই রায়ের কার্যকারিতা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে আইনি প্রক্রিয়ার এ ধীরগতি ও অনিশ্চয়তা একসময় ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রতীক্ষাকে ম্লান করে দেয়। আশার কথা হলো, এবার আইনমন্ত্রী ও এ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে সুপ্রিমকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে দ্রুত ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরের ইতিবাচক প্রত্যয় ও উদ্যোগের বিষয়টি উঠে এসেছে, যা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে এ অগ্রাধিকার যেন কোনো বিশেষ মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরি। দেশের ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন এক হাজার আট শতাধিক শিশু নির্যাতন মামলা ঝুলে রয়েছে, যার প্রতিটির পেছনেই রয়েছে কোনো না কোনো নিষ্পাপ শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।
পল্লবীর এ মামলার দ্রুত, দক্ষ ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া যেন দেশের অন্যসব বিচারাধীন শিশু নির্যাতন মামলার জন্য একটি স্থায়ী, কার্যকর ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হয়। কেবল সাময়িক, সামাজিক চাঞ্চল্য বা গণমাধ্যমের আলোচনার কারণে নয়; বরং প্রতিটি শিশুর সুরক্ষায় তদন্ত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতের আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো আইনি পথ একই গতিতে সচল রাখা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতায় এ ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে-এটাই প্রত্যাশা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ