খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১১ জুন ২০২৬ | ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বেনাপোল বন্দর শেড থেকে জব্দকৃত মালামাল বদলানোর অভিযোগ : বন্দর জুড়ে চাঞ্চল্যে

বেনাপোল প্রতিনিধি |
১২:৪৭ এ.এম | ১১ জুন ২০২৬


মিথ্যা ঘোষণায় ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনী জব্দ করেছিল বেনাপোল কাস্টমস হাউস। শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে বন্দরের জিম্মায় রাখা সেই চালান থেকেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে দামি ভারতীয় পণ্য। তার বদলে রাখা হয়েছে অতি নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিসসহ অন্যান্য সামগ্রী। কোরবানি ঈদের ছুটির মধ্যে এই ঘটনায় বন্দরজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা, স্থলবন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে বন্দরের ভেতরের কারও সহযোগিতা ছাড়া এমন দুঃসাহসিক চুরি ও জালিয়াতি সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব পরিশোধে চরমপত্র দিয়েছে কাস্টমস। অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। শেড ইনচার্জকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাফা ইমপ্লেক্স’ ১২ মার্চ ভারত থেকে একটি পণ্যচালান আমদানি করে। চালানটির ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১২০২৬০০১০০১৬৩৩৩। সিএন্ডএফ এজেন্ট হিসেবে চালানটি গ্রহণ করে বেনাপোলের মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজ। পরে চালানটি বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে রাখা হয়। আমদানি নথিতে পণ্য হিসেবে বেকিং পাউডারের ঘোষণা দেওয়া হলেও কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। পরীক্ষাকালে ১০৮ কার্টনে ঘোষণা বহির্ভূত প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় দামি শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার, ফেসওয়াশ, ক্রিম, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী পাওয়া যায়। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, এসব পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির মাধ্যমে ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হচ্ছিল।
এ ঘটনায় ২০২৩ সালের কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় চালানটি জব্দ করে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রাখা হয়। একইসঙ্গে আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চালানটি খালাস না করতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিত নির্দেশ দেয় কাস্টমস। পণ্য চালাস খালাসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করায় সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্সও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
কাস্টমস সূত্র জানায়, ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল ও ২০ মে পৃথক তিনটি চিঠিতে চালানটির ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কোরবানি ঈদের ছুটির মধ্যে তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেডে রাখা চালান থেকে জব্দ করা ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পরে সেখানে দেশীয় নিম্নমানের বিকল্প পণ্য রাখা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দারা বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করলে ২ জুন বন্দর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে চালানটি পুনরায় কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরীক্ষায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, আমদানি করা ভারতীয় দামি পণ্যের পরিবর্তে যে দেশীয় পণ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো বাংলাদেশি বসুন্ধরা ও মেঘনা শিল্প গ্র“পের বিভিন্ন কোম্পানির নাম মুদ্রিত কার্টনে রাখা ছিল। এছাড়া দেশীয় সংবাদপত্রে মোড়ানো এবং বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের স্টিকারযুক্ত পিপি বস্তাও পাওয়া গেছে। এসব আলামত প্রমাণ করে পণ্যগুলো দেশের ভেতর থেকেই সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরের প্রতিটি শেডে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত টহল ও সিসিটিভি নজরদারি রয়েছে। ৩৭ নম্বর শেডটি থাকে তালাবদ্ধ। ফলে বন্দরের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করে কয়েক কোটি টাকার পণ্য সরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।
ঘটনার পর ৩ জুন কাস্টমস হাউস থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, কাস্টমস আইনের বিধান অনুযায়ী জব্দ করা পণ্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব ওয়্যারহাউজ রক্ষকের। বন্দরের জিম্মায় থাকা অবস্থায় পণ্য পরিবর্তন ও সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। এ কারণে হারানো পণ্যের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে। একই চিঠিতে ৩৭ নম্বর শেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও কাস্টমসকে জানাতে বলা হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। শেড ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহজালালকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান দাবি করেন, জব্দ হওয়া চালানটির খালাসের জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। রাজু নামের এক ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় কাস্টমসকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সূত্র জানায়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাফা ইমপ্লেক্স’-এর মালিকানা কাগজে-কলমে একজন নারীর নামে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আমদানি পণ্য জালিয়াতি ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় আলোচিত বেনাপোলের ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন ওরফে বাবু। তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমে মিথ্যা ঘোষণায় বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। পরে কাস্টমস চালানটি জব্দ করলে বন্দরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই জব্দ করা দামি পণ্য সরিয়ে ফেলে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে। পুরো ঘটনায় সংঘবদ্ধ একটি চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ