খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১১ জুন ২০২৬ | ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ বছর পর বাজেট প্রণয়নে বিএনপি

মুক্তবাজার অর্থনীতি চালুর অন্যতম রূপকার সাইফুর রহমান

খবর প্রতিবেদন |
০১:৫৪ এ.এম | ১১ জুন ২০২৬


বাজেট প্রণয়নে সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ ভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন বিএনপি নেতা মরহুম এম সাইফুর রহমান। অর্থনৈতিক সংস্কার, বিশ্বায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির সংযোগ স্থাপন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি চালুর অন্যতম রূপকার হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। জাতীয় সংসদে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট উপস্থাপনের অনন্য রেকর্ডও রয়েছে তার দখলে।
২০০৬ সালের ৬ জুন বিএনপি সরকারের শেষ বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন এম সাইফুর রহমান।
এরপর তত্ত¡াবধায়ক সরকার, আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বতী সরকারের সময় অতিক্রম করে প্রায় দুই দশক পর আবারও বিএনপি সরকারের বাজেট আসতে যাচ্ছে। এবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন তিনি। ফলে প্রায় ২০ বছর পর বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে বিএনপির যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
জিয়ার হাত ধরে সূচনা : বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ২৬ জুন প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি টানা তিনটি বাজেট ঘোষণা করেন।
১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৯৮৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা এবং ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি।
১৯৭৯ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মির্জা নূরুল হুদাকে অর্থমন্ত্রী নিয়োগ দেন। তিনি ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরের জন্য ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।
সাইফুর রহমানের উত্থান : জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিচারপতি  আবদুস সাত্তারের আমলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এম সাইফুর রহমান। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। পরবর্তী ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে তার উপস্থাপিত বাজেটের আকার ছিল ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।
এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমুায় এলে আবারও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে ১৬ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে নতুন যুগের সূচনা করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সংস্কার, বাণিজ্য উদারীকরণ এবং কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। নব্বইয়ের দশকে দাতানির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করেন।
বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন তার অন্যতম বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে তিনি দেশে প্রথমবারের মতো ভ্যাট চালু করেন।
এ ছাড়া ২০০৩ সালে টাকা ও মার্কিন ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করে দেন, যা সে সময় একটি সাহসী ও সফল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত হয়।
রেকর্ড গড়া ১২তম বাজেট : ২০০৬ সালের ৬ জুন ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন এম সাইফুর রহমান। এটি ছিল তার উপস্থাপিত ১২তম এবং শেষ বাজেট। ওই বাজেটের আকার ছিল ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট উপস্থাপনের রেকর্ড গড়েন তিনি। পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে দু’টি বাজেট উপস্থাপন করেন এ বি মির্জ্জা মোঃ আজিজুল ইসলাম।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একই বছরের সেপ্টেম্বরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এম সাইফুর রহমান।
২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ১০টি বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরেও তিনি বাজেট দিয়েছিলেন। ফলে তার মোট বাজেটের সংখ্যা ১২ হলেও এম সাইফুর রহমানই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ১২ বার বাজেট উপস্থাপনের রেকর্ড গড়েন।
নতুন প্রেক্ষাপটে বিএনপি’র প্রত্যাবর্তন : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করে অন্তর্বতী সরকার।
এই সময়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার উপস্থাপিত বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এম সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্র“য়ারি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে একটি বিশাল বাজেট উপস্থাপন করতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে তিনি প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে দুই দশক পর আবারও বিএনপি সরকারের সরাসরি বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনা প্রত্যক্ষ করবে দেশ।
বিএনপি’র ১৭তম বাজেট : আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগে ২০০১ সালে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত সে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটসহ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট ৫৫টি বাজেটের মধ্যে বিএনপি’র উপস্থাপিত বাজেটের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৭টি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপস্থাপিত বাজেটের সংখ্যা ২৫টি।
সংখ্যার বিচারে আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও বাজেট প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এম সাইফুর রহমানের অবদান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তার প্রবর্তিত বহু নীতি আজও দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ