খুলনা | শুক্রবার | ১২ জুন ২০২৬ | ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জাতির প্রত্যাশা পূরণে এবারের বাজেট করা হয়েছে : অর্থমন্ত্রী

৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব ঘাটতি আড়াই লাখ কোটি

খবর প্রতিবেদন |
০২:৩০ এ.এম | ১২ জুন ২০২৬


‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এটি গত অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের বিশাল এই ঘাটতি প‚রণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় ছিল ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা।
এছাড়া আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হচ্ছে। গত ১২ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট। এছাড়া বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আমির খসরুর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। এরপর স্পিকার অর্থমন্ত্রীকে বাজেট উত্থাপন করার জন্য আহŸান জানান। বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটিই প্রথম বাজেট। 
অর্থমন্ত্রী : অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ভিশন-২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিশ্র“তিগুলো বাস্তবায়নের ঘোষণা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে এবং তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে।
আমির খসরু বলেন, জাতীয় বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি রোডম্যাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।
অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন বৈশ্বিক ভ‚-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মেরুকরণ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আশাবাদ ব্যক্ত করে আমির খসরু বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে জনমিতিক লভ্যাংশ, দীর্ঘায়ু লভ্যাংশ এবং গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগও তৈরি হবে।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।
বাজেটে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো-সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু বলেন, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য-এই চারটি নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রস্তাবিত বাজেট সেই উদ্যোগেরই প্রতিফলন।
আশা প্রকাশ করে আমির খসরু বলেন, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ, রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভ‚মিকা রাখবে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানান। আগামী ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই অর্থবছর কার্যকর হবে।
এত ব্যয় কোন খাতে : বাজেটে ব্যয়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব হলো-বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বাজেটে ক্রমান্বয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। 
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাত ও তৃণমূলের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। 
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। সামাজিক খাতের এই বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিফলন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
আয়ের লক্ষ্যমাত্রা : সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব আছে।
ঘাটতি মেটানো হবে কীভাবে : প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে নির্বাহ করা হবে।
অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্বাহ করা হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ