খুলনা | রবিবার | ১৪ জুন ২০২৬ | ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

গুনাহ

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
১২:০৫ এ.এম | ১৩ জুন ২০২৬

 

মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশের পরিপন্থী সকল কাজকেই গুনাহ বলা হয়। গুনাহ মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনের জন্যই অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে, আত্মাকে দুর্বল করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। গুনাহের কারণে মানুষ দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, অপমান ও নানা ধরনের কষ্টের সম্মুখীন হয়। অনেক সময় জীবনের সুখ-শান্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্তরে অস্থিরতা ভর করে। আর আখেরাতে গুনাহের পরিণতি আরও ভয়াবহ। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করা।
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “তোমাদের উপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল।” (সূরা আশ-শূরা: ৩০)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে মানুষের অনেক দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের পেছনে তার নিজের ভুল ও গুনাহের প্রভাব থাকতে পারে। অবশ্য সব বিপদই গুনাহের শাস্তি নয়; অনেক সময় তা পরীক্ষা। তবে গুনাহ মানুষের জীবনে অশান্তি ও অকল্যাণ ডেকে আনেÑএ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সে যদি তাওবাহ করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসে, তবে তার অন্তর আবার পরিস্কার হয়ে যায়।” গুনাহের প্রকৃত ক্ষতি এখানেই। এটি মানুষের হৃদয়কে ধীরে ধীরে অন্ধকার করে দেয়। একসময় মানুষ গুনাহকে গুনাহ মনে করাও ছেড়ে দেয়। তখন তার বিবেক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়।
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “তোমরা নিজেদের হিসাব নাও, তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে।” একজন মুমিনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রতিদিন নিজের কাজের মূল্যায়ন করলে মানুষ সহজেই নিজের ভুলগুলো ধরতে পারে এবং সংশোধনের সুযোগ পায়।
গুনাহ সাধারণত তিন প্রকারের হয়ে থাকে : প্রথমত, আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার উপর যে সকল ইবাদত ফরয করেছেন সেগুলো ছেড়ে দেওয়া। যেমন সালাত, সাওম, যাকাত ইত্যাদি। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ আদায় না করা, রোজা ত্যাগ করা কিংবা সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও যাকাত না দেওয়া কবীরা গুনাহ। এসব ইবাদত মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে। তাই এগুলো অবহেলা করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা’য়ালা এবং বান্দার মধ্যকার গুনাহ। যেমন মদ পান করা, সুদ খাওয়া, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া। এসব গুনাহ মানুষের চরিত্রকে দুর্বল করে এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। তবে এ ধরনের গুনাহের জন্য মানুষ আন্তরিকভাবে তাওবাহ করলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমা করে দিতে পারেন।
তৃতীয়ত, বান্দার হকের সঙ্গে সম্পর্কিত গুনাহ। এ ধরনের গুনাহ সবচেয়ে কঠিন ও ভয়াবহ। কারণ এখানে অন্য মানুষের অধিকার জড়িত থাকে। যেমন অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা, ওয়ারিসের প্রাপ্য সম্পদ না দেওয়া, গীবত করা, অপবাদ দেওয়া, প্রতারণা করা কিংবা কারো সম্মানহানি করা। রাসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যার কাছে তার ভাইয়ের কোনো অধিকার নষ্ট হয়েছে, সে যেন আজই তা আদায় করে নেয়; কারণ আখেরাতে সেখানে টাকা-পয়সা থাকবে না, থাকবে শুধু নেকি ও গুনাহ।”
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “সবচেয়ে বড় গুনাহ সেই গুনাহ, যাকে মানুষ ছোট মনে করে।” এই কথার মধ্যে গভীর শিক্ষা রয়েছে। অনেক মানুষ মনে করে, “এতটুকু মিথ্যা বললে কী হবে?”, “একটু গীবত করলেই বা ক্ষতি কী?” কিন্তু ছোট ছোট গুনাহ জমতে জমতে বড় আকার ধারণ করে। যেমন ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা একসময় নদী পূর্ণ করে দেয়।
একজন বুজুর্গ বলেছেন, “আমি গুনাহের প্রভাব আমার ঘরের পশুর আচরণ এবং পরিবারের ব্যবহারের মধ্যেও দেখতে পেতাম।” অর্থাৎ গুনাহ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আরেকজন মনীষী বলেছেন, “গুনাহের পর গুনাহ মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যে, সে গুনাহ করেও লজ্জা অনুভব করে না।” এটি মানুষের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর অবস্থা। কারণ লজ্জাবোধ ও অনুশোচনা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি শিক্ষাণীয় ঘটনা বর্ণিত আছে। এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন নানা গুনাহে লিপ্ত ছিল। একদিন সে একজন আলেমের কাছে এসে বলল, “আমি কি ক্ষমা পেতে পারি?” আলেম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি তোমার ভুল স্বীকার করো?” সে বলল, “হ্যাঁ।” আলেম বললেন, “যে দরজা দিয়ে তুমি গুনাহের পথে গিয়েছিলে, সেই দরজা দিয়েই আল্লাহর দিকে ফিরে আসো। আল্লাহর রহমত তাঁর ক্রোধের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।” এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
মানুষ মাত্রই ভুল করে। কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সমস্ত আদমসন্তান ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে তারাই উত্তম যারা তাওবাহ করে।” তাই গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হওয়ার পরিবর্তে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই হলো মুমিনের পথ।
তাওবাহ হলো গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, তা পরিত্যাগ করা, পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা এবং মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আন্তরিক তাওবাহ মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। এটি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
আসুন, আমরা সবাই নিজেদের আমল পর্যালোচনা করি, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি এবং ভুল হয়ে গেলে দ্রুত মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। কারণ সফল সেই ব্যক্তি, যে নিজের ভুল বুঝতে পারে, তাওবাহ করে এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকল প্রকার গুনাহ থেকে হেফাজত করুন, অন্তরকে পবিত্র রাখুন এবং তাওবাহর মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন। 
লেখক: বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ১ দিন আগে