খুলনা | সোমবার | ১৫ জুন ২০২৬ | ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

তীব্র তাপদাহে বিষাক্ত হচ্ছে ঘেরের পানি : উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ার শঙ্কা

মোংলার মৎস্য খাতে বড় ধসের আশঙ্কা, পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত প্রায় ১৪ হাজার চাষি

মাহমুদ হাসান, মোংলা |
১১:৫৮ পি.এম | ১৪ জুন ২০২৬


জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে মোংলা উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র বিপর্যয়। চৈত্র-বৈশাখের টানা অনাবৃষ্টি, তীব্র তাপদাহ আর ঘেরের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে মড়ক লেগেছে মাছের ঘেরে। প্রচন্ড রোদে পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেওয়ায় প্রতিদিন মরে ভেসে উঠছে লাখ লাখ টাকার বাগদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছ। এনজিও কিংবা ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ঘের করা শত শত চাষি এখন পুঁজি হারিয়ে সম্পূর্ণ সর্বশান্ত ও নিঃস্ব হওয়ার পথে। মৎস্য বিভাগ বলছে, অপরিকল্পিত চাষের কারণেই প্রতি বছর এমন ঘটনা ঘটছে।
ভৌগোলিক কারণে মোংলা উপজেলার মাটি ও পানি অতিরিক্ত লবণাক্ত। ফলে এখানে ধান কিংবা অন্য কোনো কৃষিজ ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। জীবিকার তাগিদে এই উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা শুধুই মৎস্য চাষ। স্থানীয় মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মোংলা উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে মোট ১৩ হাজার ৭শ’ ৬৮ জন চাষি বাগদা, গলদা ও বিভিন্ন প্রজাতীর সাদা মাছ চাষের সাথে সরাসরি জড়িত। যার মধ্যে বাগদা চাষি ৬ হাজার ৭০ জন, গলদা চাষি ১ হাজার ৮শ’ ৫০ জন, সরকারি ক্লাস্টার চাষি ১০০ জন এবং ছোট পুকুর ও সাদা মাছ চাষি রয়েছেন ৫ হাজার ৭শ’ ৪৮ জন।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ঘেরের পানির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। দুপুরের তীব্র রোদে ঘেরের তলার পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস। এতে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রতিদিন মড়ক দেখা দিচ্ছে মাছে। ভুক্তভোগী মৎস্য চাষিরা জানান, ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা ঘেরে পোনা ছেড়েছিলেন। কিন্তু অনাবৃষ্টি আর গরমে পানি শুকিয়ে মাছ লাল হয়ে মরে ভেসে উঠছে। ধারদেনা শোধ করা তো দূরের কথা, এখন পরিবারের ভরণপোষণ চালানোই তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরেও এই উপজেলায় ৫ হাজার ৬শ’ ২১ মেট্রিক টন বাগদা ও গলদা এবং ৭ হাজার ৮শ’ ৮৫ মেট্রিক টন সাদা মাছ উৎপাদন হয়েছিল। তবে তীব্র তাপদাহের কারণে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৎস্য সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে চলতি অর্থ বছরে মোংলায় মাছের সামগ্রিক উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ কমে যেতে পারে। যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধস ডেকে আনবে। এই চরম বিপর্যয় থেকে উপকূলের প্রধান অর্থনৈতিক খাতটিকে রক্ষা করতে এবং দেনার দায়ে জর্জরিত প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মোংলায় চিংড়ি ঘের মালিকরা বলছে, আমরা একবারে সর্বশান্ত হয়ে গেলাম। এইবারের মতো এত গরম আর কোনো বছর দেখি নাই। চৈত্র-বৈশাখ পার হয়ে গেল, কিন্তু গরম কমার কোনো লক্ষণ নাই। ঘেরের পানি রোদের তাপে একদম ফুটন্ত গরম পানির মতো তপ্ত হয়ে উঠছে। ঘেরে এমনিতেই নদীর পানি ঠিকমতো তুলতে পারি নাই, তার ওপর পানির গভীরতা কম থাকায় রোদ সরাসরি তলায় গিয়ে লাগছে।
গত কয়েকদিন ধরে দুপুরের পর ঘেরের পানি বিষিয়ে লালচে হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সকালে এসে দেখি হাজার হাজার বাগদা আর গলদা চিংড়ি মরে পানির ওপর ভেসে উঠছে। ধার-দেনা আর ব্যাংক লোন নিয়ে এইবার ঘেরে পোনা ছাড়ছিলাম, আশা ছিল মাছ বেচে আগের সব ঋণ শোধ করব। কিন্তু চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল। একে তো প্রচণ্ড তাপদাহ, তার ওপর পানিতে লবণ আর ভাইরাসের আক্রমণ-সব মিলিয়ে মাছের এই মড়ক ঠেকানোর কোনো উপায় পাচ্ছি না। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব আর পাওনাদারদের টাকাই বা কীভাবে শোধ করব, সেই চিন্তায় রাতে চোখে ঘুম নাই। সরকারি কোনো বড় সাহায্য বা প্রণোদনা না পেলে আমাদের মতো ছোট ঘের মালিকদের এবার না খেয়ে রাস্তায় বসা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ জাহিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা তথা উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এখানকার অধিকাংশ চাষি এখনো সনাতন ও অপরিকল্পিত পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করছেন। অনেকেই ঘেরে কোনো ধরনের সম্পূরক খাবার না দিয়ে কেবল প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভর করে মাছ ছেড়ে রাখেন। খাবারবিহীন এই চাষ পদ্ধতি চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম কমিয়ে দেয়, যার ফলে জলবায়ুুর সামান্য পরিবর্তনেই ঘেরে মড়ক দেখা দেয়।
আমাদের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে দেখা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে ঘেরের আয়তন বিশাল করা হলেও সেগুলোর পানির গভীরতা থাকে মাত্র ১ থেকে ১.৫ ফুট। তীব্র তাপদাহে এই অল্প পানি দ্রুত ফুটন্ত গরম হয়ে যায় এবং অক্সিজেন সংকটে মাছ মারা যায়। তদুপরি, অনেক চাষি বেশি লাভের আশায় শতাংশ প্রতি নির্ধারিত ঘনত্বের চেয়ে অতিরিক্ত পোনা ছাড়েন, যা এই বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে।
আমরা চাষিদের বারবার অনুরোধ করছি আপনারা এই সনাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি পরিহার করুন।ঘেরের গভীরতা কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ ফুট করুন, সঠিক নিয়মে সুষম ও মানসম্মত মৎস্য খাদ্য প্রয়োগ করা, পোনা ছাড়ার আগে অবশ্যই পিসিআর (চঈজ) ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসমুক্ত পোনা নিশ্চিত করতে পারলে ঘেরে মাছ চাষ করে লাবভান হওয়া সম্ভব। 
আমরা নিয়মিত চাষিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চাষের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। চাষিরা সচেতন না হলে এবং অপরিকল্পিত চাষ বন্ধ না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে। 
চলতি অর্থ বছরে মোংলায় ১৩ হাজার ৭৬৮ জন মৎস্য চাষির মধ্য থেকে মাত্র ৬০ জনকে সরকারিভাবে মাছ চাষের উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ