খুলনা | মঙ্গলবার | ১৬ জুন ২০২৬ | ৩ আষাঢ় ১৪৩৩

বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট, নেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন

ভদ্রা নদী খননের মাটি চাপা পড়ে ডুমুরিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত

শেখ আব্দুস সালাম, ডুমুরিয়া |
০১:৩২ এ.এম | ১৬ জুন ২০২৬


নদী খননের মাটি চাপা পড়ে ডুমুরিয়ার আটলিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসত ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসনের বাসিন্দারা। নদীর খননকৃত মাটি যত্রতত্র ভাবে ফেলার কারণে বসত ঘরগুলো ভেঙ্গে গেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। নষ্ট হয়ে গেছে টিউবওয়েল ও টয়লেট। এ পরিস্থিতিতে গত ৪ মাস যাবত  চুকনগর আবাসনের ঘর হারা ২শ’ পরিবারের এক হাজারের অধিক নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ খোলা আকাশের নিচে মাঠের মধ্যে ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর ভাবে বসবাস করছে। তাদের চাহিদার বিপরীতে রয়েছে খাদ্যের চরম সংকট। নলকূপ নষ্ট হয়ে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। নেই বিদ্যুতের কোন সুব্যবস্থা। 
জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্র নদীর তীরবর্তী চর ভারাটি জায়গায় সরকারি অর্থায়নে আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া এলাকায় ১৪৯টি, চুকনগর সদরে ১৬৩টি ও কাঁঠালতলায় ৭৯টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর তৈরি করা হয়। বসবাস উপযোগী ঘরগুলো জমিসহ ভূমিহীন, অসহায় ও ছিন্নমূল পরিবারকে দেয়া হয়। সে থেকে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করে আসছিল। স¤প্রতি ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে নদী খননের কাজ শুরু করেন যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নদী খননের মাটির চাপে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের চাল, দেয়াল, জানালা ভেঙে মাটি ভেতরে ঢুকে গেছে। নদী খননকালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের ব্যবহার্য অধিকাংশ টয়লেট ভেঙে দেয়া হয়েছে। নষ্ট হয়েছে অনেক ঘরের আসবাবপত্র।
বরাতিয়া আবাসনের বাসিন্দা আঃ রহমান সরদার, বিশ্বজিৎ দাস, শাহিদা বেগম, ঝর্না রানী, তপন দাস, ইমন ধর, যমুনা বেগম, জোসনা খাতুনসহ ১০টি পরিবারের ঘর নদী খননের মাটি চাপা পড়ে ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা বলেন আমাদের থাকার কোনো জায়গা নাই। জায়গা জমি থাকলে সরকারি ঘরে থাকতাম না। আমরা এখন যাবো কোথায়!
চুকনগর আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা জয়গুন বিবি, শহিদুল ইসলাম, ফেলু বেগম, ফাতেমা বেগম, সেলিম শেখ, হযরত আলি, কল্যাণী সরকার, ঝর্না সরকার, আনোয়ারা বেগম, মোমেনা, ফাতেমা বিবি, নমিতা বিশ্বাস, ফাতেমা লেওকাত, স্বপ্না হাওলাদার, আল আমিন, রাশেদ, জয়া সরকারসহ আশ্রয়ণের বাসিন্দারা জানান, নদী খননের মাটি চাপে ৫ মাস যাবত তারা বলফিল্ড এলাকায় খোলা আকাশের নিচে ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর ভাবে বসবাস করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২২ সালে তিনটি ধাপে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, বরাতিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করতে এ প্রকল্প হাতে নেয় তৎকালীন সরকার। উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর, বরাতিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় ভদ্রা নদীর চর ভারাটি খাস জমিতে দুই কক্ষবিশিষ্ট আধা পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। 
যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ ৫টি নদীর (হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী) ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ হাতে নেয় সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড মাধ্যমে নদী খনন শুরু হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় যশোর ও খুলনা এলাকার হরিহর নদী ৩৫ কিলোমিটার, হরি-তেলিগাতি নদী ২০ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদী ১৮.৫ কিলোমিটার, টেকা নদী ৭ কিলোমিটার ও শ্রীনদী ১ কিলোমিটারসহ মোট ৫টি নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ চলছে। নদী খননের পাশাপাশি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, মাটি সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। পরিবেশবান্ধব পুনঃখনন নিশ্চিত করতে টার্ফিং ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে আটলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন জানান নদী খননের কবলে পড়া অসহায় পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ইউএনওর সাথে কথা বলেছি। দ্রুত একটি ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বস্থ করেছেন তাঁরা।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার বলেন উপজেলার চুকনগর, বরাতিয়া ও কাঁঠালতলা গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি চাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে। খবর পেয়ে সোমবার সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। খুব তাড়াতাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন পরিবারের জন্য তারা ব্যবস্থা নেবেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ