খুলনা | বুধবার | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

পাইকগাছায় মাদক ও অনলাইন জুয়ার ওপেন মার্কেট : ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ, বাড়ছে অপরাধ

পাইকগাছা প্রতিনিধি |
১১:৫২ পি.এম | ১৬ জুন ২০২৬


পাইকগাছা উপজেলা জুড়ে মাদক ও জুয়ার ভয়াল থাবা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয় বরং তা এক প্রকাশ্য সামাজিক মড়কে রূপ নিয়েছে। পৌর শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের আনাচে-কানাচে গেড়ে বসেছে মাদক ও জুয়ার বিষাক্ত সিন্ডিকেট। ইয়াবা, ফেনসিডিল আর গাঁজার রমরমা কারবারের সমান্তরালে এখন যোগ হয়েছে স্মার্টফোনের সর্বনাশা অনলাইন জুয়ার ডিজিটাল মরণফাঁদ। এই জোড়া থাবায় উপজেলার উদীয়মান তরুণ ও যুবসমাজ ধ্বংসের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও পারিবারিক সহিংসতা। মাঠপর্যায়ের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও মাদক সম্রাট ও জুয়াড়িদের প্রকাশ্য বিচরণ এবং তা রুখতে প্রশাসন ও সুশীল সমাজের দৃশ্যমান কার্যকর ভূমিকার অভাব নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে মরণনেশা মাদক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা নিত্যনতুন ও অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে। এর চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে ‘ডিজিটাল জুয়া’। উপজেলার চায়ের দোকান, পরিত্যাক্ত ঘর, সেলুন, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে বসে স্মার্টফোনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকেরা। এই জুয়া ও মাদকের চড়া টাকা জোগাড় করতে গিয়েই শান্ত স্বভাবের কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে নানা দুর্ধর্ষ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। ফলে পুরো উপজেলার সামাজিক নিরাপত্তা ও চেইন অব কমান্ড এখন চরম হুমকির মুখে। মাদক ও জুয়ার এই মরণকামড়ে সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। সন্তানদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ দেখে শত শত অভিভাবক এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। টাকার জন্য ঘরে ঘরে অশান্তি, বাবা-মার ওপর সন্তানের হামলা, মারামারি এবং ডিভোর্সের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এলাকার শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এখনই যদি এই দুই ব্যাধিকে উপড়ে ফেলা না যায়, তবে পাইকগাছার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে যাবে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন কেবল চুনোপুঁটি ধরে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কোনো ধরণের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের তোয়াক্কা না করে মূল মাদক সম্রাট ও জুয়ার বোর্ড পরিচালনাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সমাজকে বাঁচাতে প্রতিটি এলাকায় শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় যুবকদের সমন্বয়ে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য মাঠের এই তীব্র ক্ষোভের মুখে স্থানীয় প্রশাসন তাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তৎপরতা চালানোর দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের নীতি সব সময়ই ‘জিরো টলারেন্স’। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ঝটিকা অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অপরাধীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয় থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না এবং সামাজিক এই ব্যাধি নির্মূলে প্রশাসনের অভিযান আরও কঠোর ও জোরদার করা হবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, পাইকগাছাকে এই ভয়াবহ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল কাগুজে আশ্বাস বা দায়সারা অভিযানে কাজ হবে না। প্রশাসনকে যেমন তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে কঠোর ও নিরপেক্ষ আইনি এ্যাকশনে যেতে হবে, তেমনি পরিবার ও সমাজকেও ঘরে-বাইরে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ব্লেম-গেম বা একে অপরকে দোষারোপ বন্ধ করে এখনই একযোগে মাঠে না নামলে এই সামাজিক মহামারি রোখা অসম্ভব।

 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ