খুলনা | শুক্রবার | ১৯ জুন ২০২৬ | ৬ আষাঢ় ১৪৩৩

শনিবারের সমাবেশ সফলে প্রেস ব্রিফিংয়ে পরওয়ার

সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার ও গণরায়ের বাস্তবায়ন চাই

খবর বিজ্ঞপ্তি |
০১:৫৪ এ.এম | ১৯ জুন ২০২৬


জুলাই সনদ বাস্তবায়ন শুধু জামায়াত-এনসিপি বা ১১ দলের নয়, এ দাবি দেশের ৭০ ভাগ মানুষের। কেন না তারা গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টি সংসদে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সংসদে সমাধানযোগ্য একটি বিষয়কে রাজপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি ঠিক হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। 
শনিবার খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা রাজপথে নামতে চাই না। চাই সংসদে সবকিছু সমাধান করতে। কিন্তু সরকার আমাদেরকে বাধ্য করলে রাজপথ হবে চ‚ড়ান্ত জায়গা। তিনি বলেন, প্রেমতো একতরফা হয় না। 
সীমান্তে পুশইন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এটি নিয়ে সংসদে একজন এমপি নোটিশ দিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে সেটি প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। এতেই প্রমাণ হয় কোথা থেকে কি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ আমাদের ওপর দাদাগিরি করে আধিপত্যবাদের সেবাদাস বানাক সেটি আমরা চাই না। সব বিভাগের সমাবেশ শেষ হলে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও তিনি উলে­খ করেন। 
ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার বিএনপি’র সমালোচনা করে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় করণের নজির আমরা দেখেছি। কিন্তু এখনতো আরও বেশি দেখছি। স্থানীয় সরকার বিভাগের সব নিয়মকে তোয়াক্কা না করে সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ এমনকি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও প্রশাসক বসিয়ে দলীয় করণের নজির স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন দেখছি বিএনপি’র স্লোগান পরিবর্তন করা উচিত। সবার আগে বাংলাদেশ নয়, সবার আগে বিএনপি স্লোগান হওয়া উচিত।
তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়, একচ্ছত্র দলীয়করণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিসহ সার্বিক জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। 
পরওয়ার বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের হাজারো শহীদের রক্ত এবং ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী স্মৃতির বিনিময়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষ একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা করেছিল। সেই রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩৩টি রাজনৈতিক দল দফায় দফায় বৈঠক করে ৮৪টি সাংবিধানিক, আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ে একমত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, বিগত ১২ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৫ কোটি মানুষ (৭০ শতাংশ ভোটার) কোনো নোট অফ ডিসেন্ট বা দ্বিমত ছাড়াই এই জুলাই সনদের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়ে একে গ্রহণ করেন। নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা এই সনদের পক্ষে সারাদেশে ক্যাম্পেইন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তারা ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়ে বলছেন যে, এই গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ নাকি বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী।
প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশের বর্তমান জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকার গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে। আধুনিক চিকিৎসার এই যুগে কেবল সরকারের নির্লিপ্ততা ও ভ্যাকসিনের অব্যবস্থাপনার কারণে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকটি শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকার শুধু অতীতের দোষ দিয়ে বেঁচে যেতে চায়।
সারাদেশে এবং বিশেষ করে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে উলে­খ করে পরওয়ার বলেন, নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের আয়রন মার্কেটে প্রতিটি দোকান থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করায় গত একসপ্তাহ ধরে ৭০টি দোকান বন্ধ রয়েছে। এছাড়া শিশু হত্যা, খন্ড-বিখন্ড লাশ উদ্ধার, মসজিদের ভেতর ঢুকে গুলি এবং ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকান্ডের মতো বর্বর ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২১ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুলনা সফরের কথা উলে­খ করে তিনি  বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো এখন আইনশৃঙ্খলার চেয়ে সংবিধান নিয়ে বেশি ব্যস্ত।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন দাবিতে খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠের এ সমাবেশে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ উপস্থিত হবেন উলে­খ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ জন্য শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি ১১ দলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত থাকবে। আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ হর্ণ থাকবে সার্কিট হাউজ ছাড়াও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। যাতে মানুষ সার্কিট হাউজে না গিয়েও বক্তব্য শুনতে পারে। বিভাগের বাকী নয়টি জেলা থেকে আগত যানবাহনগুলো নির্দিষ্ট স্থানে রাখার জন্য সাংগঠনিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুপুর ২টা থেকে আসরের নামাজের আগ পর্যন্ত সমাবেশের মূল কার্যক্রম চলবে। তবে এর আগেও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করবেন।
সমাবেশ বাস্তবায়নের সমন্বয়ক এড. শাহ আলমের পরিচালনায় সভাপতির বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক ও সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক মোবারক হোসাইন সদস্য সচিব, জামায়াতে ইসলামীর মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। এ সময় জেলা জামায়াতে ইসলামী আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর মাস্টার শফিকুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির মহানগর সংগঠক আহম্মদ হামিম রাহাত, রমজান শেখ, খালিদ সাইফুল­াহ, নূরুল হক নূর, যুথি আক্তার ও রফিক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক ও মহানগর সভাপতি মুফতি শরীফ সাঈদুর রহমান, হাফেজ মোঃ শহীদুল ইসলাম, মাওলানা মুজাহিদুর রহমান ও জেলার মাওলানা মাহফুজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের খুলনা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের জেলা সেক্রেটারি মুফতি ইব্রাহিম খলিল, বাংলাদেশ লেবার পার্টি নগর সভাপতি অধ্যক্ষ এস এম সাইফুদ্দোহা, নগর জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, নগর সহকারী প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, জেলা সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, স ম এনামুল হক, মোঃ আব্দুল গফুর, মহানগরী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেনসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রেসব্রিফিং শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার ও জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ নগরীর স্যার ইকবাল রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড়সহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের লিফলেট বিতরণ করেন। পরে তারা সার্কিট হাউজ মাঠের নির্মাণাধীন সমাবেশ মঞ্চ পরিদর্শন করেন। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার আগামী ২০ জুন শনিবার সার্কিট হাউস ময়দানে ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশে জনদুর্ভোগ হতে পারে উলে­খ করে নগরবাসীর কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ