খুলনা | শনিবার | ২০ জুন ২০২৬ | ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

তাওবাহ

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:৫৯ এ.এম | ১৯ জুন ২০২৬


মানবজীবন ভুল ও পদস্থলনের ঊর্ধ্বে নয়। পাপের ধুলোমলিন পথে হোঁচট খাওয়া মানুষের স্বভাব, কিন্তু সেই পতনের মধ্যেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা রেখেছেন এক অপার রহমতের দরজাÑতাওবাহ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়; বরং আত্মার পুনর্জাগরণ, হৃদয়ের পরিশুদ্ধি এবং রবের দিকে ফিরে আসার এক অনন্ত আহŸান।
তাওবাহ অর্থ মহান আল্লাহ তা’য়ালার অবাধ্যতার পথ থেকে ফিরে এসে তাঁর আনুগত্যের পথে স্থির হওয়া। এর মধ্যে রয়েছে গভীর অনুশোচনা, অতীত গুনাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ভবিষ্যতে পুনরায় সেই পথে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প। এটি এমন এক আত্মিক যাত্রা, যেখানে মানুষ নিজের ভাঙা সত্তাকে গুছিয়ে নতুনভাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালার সান্নিধ্যে ফিরে যায়।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ কাছে খাঁটি তাওবাহ করো। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত।” (সূরা আত-তাহরীম : ৮)
ইসলাম মানুষকে পাপের কারণে হতাশ হতে শেখায় না; বরং শেখায় ফিরে আসতে। কারণ মানুষ ভুল করবেÑএটাই তার স্বভাব। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাহকারী।” (তিরমিযি) অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবাহ করে, সে যেন এমন ব্যক্তি যার কোনো গুনাহ নেই।” (ইবনে মাজাহ)
মানব ইতিহাসের সূচনালগ্নেই তাওবাহর এই মহিমা ফুটে ওঠে। আদম আলাইহিস সালাম শয়তানের প্ররোচনায় পদস্থলনের শিকার হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অহংকারে স্থির থাকেননি। বরং অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে ফিরে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। ফলে তিনি লাভ করেন মহান আল্লাহ তা’য়ালার বিশেষ রহমত ও দয়া। অন্যদিকে ইবলিস মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ অমান্য করে নিজের ভুল স্বীকার না করে অহংকারে স্থির থাকে, যার পরিণতি ছিল চিরস্থায়ী অভিশাপ। এই দুই ঘটনার মাঝে মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা লুকিয়ে আছেÑমানুষের মর্যাদা তার নির্ভুলতায় নয়; বরং ভুলের পর মহান আল্লাহ তা’য়ালার দিকে ফিরে আসার মধ্যেই তার মুক্তি।
মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হলো বনি ইসরাইলের সেই ব্যক্তি, যে একশ’ জন মানুষকে হত্যা করার পরও আন্তরিক তাওবাহর মাধ্যমে ক্ষমা লাভ করেছিল। (সহীহ বুখারি) এই ঘটনা প্রমাণ করে, গুনাহ যতই গভীর হোক না কেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমত তার চেয়েও বিস্তৃৃত।
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ তা’য়ালার ক্ষমার আনন্দকে তুলনা করেছেন এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার সঙ্গে। তিনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তি মরুভ‚মিতে তার বাহনসহ খাদ্য ও পানীয় হারিয়ে ফেলল, তারপর মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে হঠাৎ তা ফিরে পেলÑসে যতটা আনন্দিত হয়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর বান্দার তাওবাহয় তার চেয়েও অধিক আনন্দিত হন। (সহীহ বুখারি)
এক বর্ণনায় এসেছে, ইবলিস ঘোষণা করেছিল, সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে থাকবে যতক্ষণ তাদের প্রাণ থাকে। তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা ঘোষণা করেন, “আমি তাদের জন্য তাওবাহর দরজা খোলা রাখব যতক্ষণ তাদের প্রাণ থাকে।” (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা) অর্থাৎ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের জন্য আশার আলো অবশিষ্ট থাকে।
তাওবাহর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা শুধু গুনাহ ক্ষমাই করেন না; বরং কখনো কখনো সেই গুনাহকে নেকিতে রূপান্তরিত করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “তবে যারা তাওবাহ করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের মন্দ কাজগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেবেন। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-ফুরকান : ৭০)
এ এক অপার করুণা, যেখানে মানুষের অতীত শুধুই মুছে যায় না; বরং তা নতুন আলোর সূচনায় রূপ নেয়। তাই কোনো গুনাহগার মানুষের জন্য হতাশা নয়, বরং তাওবাহই তার নতুন জীবনের দরজা।
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, বান্দা যদি বারবার গুনাহ করে এবং বারবার তাওবাহ করে, তবে তার কর্তব্য হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালার দরজায় ফিরে আসা অব্যাহত রাখা। কারণ তাওবাহ অব্যাহত থাকলে শয়তানই একসময় নিরাশ হয়ে পড়ে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবাহকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা : ২২২)
মানুষের জীবন জুড়ে রয়েছে নফসের দুর্বলতা, দুনিয়ার মোহ এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা। তবুও মুমিনের পরিচয় তার পতনে নয়, বরং পতনের পর তার উঠে দাঁড়ানোতে। সে যতবারই পথ হারায়, ততবারই ফিরে আসে তার রবের দিকে। এই অবিরাম প্রত্যাবর্তনই তাওবাহ, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, হতাশা থেকে আশার পথে এবং দূরত্ব থেকে নৈকট্যের পথে নিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত তাওবাহ হলো সেই সেতু, যা বান্দাকে তাঁর রবের সঙ্গে আবার যুক্ত করে। এটি ভাঙা হৃদয়ের জন্য আরোগ্য, ক্লান্ত আত্মার জন্য প্রশান্তি এবং পথভোলা মানুষের জন্য ফিরে আসার এক চিরন্তন আহŸান।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে খাঁটি তাওবাহর তাওফিক দান করুন, আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
লেখক: বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ২৩ ঘণ্টা আগে

ইসলাম

প্রায় ৭ দিন আগে