খুলনা | বুধবার | ০৫ অগাস্ট ২০২৬ | ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

আমরা কি শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নাকি প্রতিরোধী হতে শিখব?

জয়া মাহবুব |
০১:৩৪ এ.এম | ২০ জুন ২০২৬


একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলে আমাদের সমাজে চিরচেনা এক দৃশ্য দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্ষোভে ফেটে পড়ে, সংবাদমাধ্যমে চলে দিনরাত আলোচনা, রাস্তায় নামে ন্যায়বিচারের দাবি। আমরা সবাই কিছুদিনের জন্য গভীর শোক ও উদ্বেগে ডুবে থাকি। কিন্তু দিনশেষে, সময়ের নিয়মে সেই আলোচনার উত্তাপ কমে আসে। নতুন কোনো সংকট এসে পুরোনো ট্র্যাজেডিকে আড়াল করে দেয়, জনমত ঘুরে যায় অন্যদিকে। অথচ যে প্রশ্নগুলো বুক ফুঁঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই থেকে যায় উত্তরহীন।
রামিসার ঘটনাও আমাদের সামনে এমনই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে গেছে। একটি ট্র্যাজেডি যখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমরা জানতে চাই, কী ঘটেছিল? অপরাধী কে? কীভাবে দ্রুত বিচার হবে? কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি জরুরি প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়: এমন ঘটনা যাতে আর কখনো না ঘটে, সেজন্য আমরা কাঠামোগতভাবে কী করছি?
মিডিয়া স্টাডিজের গবেষণা বলছে, বড় কোনো ঘটনার পর জনমত ও সংবাদ কাভারেজ শুরুতে তীব্র থাকলেও খুব দ্রুতই তা হ্রাস পায়। একে বলা হয় “ইস্যু ফেটিগ”। সংবাদমাধ্যমের স্বভাবই হলো নতুন তথ্যের পেছনে ছোটা। কিন্তু সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ধীরগতির। ফলে ঘটনার পেছনের মূল কারণগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা আর টিকে থাকে না।
আমাদের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ , কিন্তু ‘প্রতিরোধমূলক'  নই। ট্র্যাজেডির পর ক্ষোভ প্রকাশ করা জরুরি, কারণ তা বিচারের দাবিকে বেগবান করে। কিন্তু শুধু ক্ষোভ কোনো সমাজকে নিরাপদ করতে পারে না। নিরাপত্তা আসে তখনই, যখন আমরা ঘটনার গভীরে গিয়ে মূল কারণগুলো উপড়ে ফেলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিই।
ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি বলে, শিশু ও কিশোরদের বিপদের সংকেত অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তারা প্রায়ই নিজেদের ট্রমা বা ভয় লুকিয়ে রাখে; বিশেষ করে যখন তারা মনে করে তাদের কথা কেউ শুনবে না বা উল্টো তাদেরই ভুল বোঝা হবে। এখানে আমাদের সমাজের এক বড় বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ইউনিসেফ-এর বিভিন্ন চাইল্ড প্রটেকশন জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ শিশু প্রতি মাসে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। আমরা যখন ‘শাসনের নামে নির্যাতন’ বা পিটিয়ে মানুষ করার সংস্কৃতিকে সামাজিকভাবে বৈধতা দিই, তখন শিশুর মানসিক দেয়ালটি প্রথম ভেঙে যায়। পারিবারিক যোগাযোগ যদি কেবলই শাসন আর নিয়ন্ত্রণভিত্তিক বা কড়া শাসনের হয়, তবে শিশুরা যেকোনো বড় বিপদ বা সাইবার বুলিং ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো আধুনিক ডিজিটাল ফাঁদে পড়লেও তা মা-বাবার ভয়ে নিজেদের মধ্যে চেপে রাখে।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, শিশুদের কেবল বাহ্যিক নিরাপত্তা দিলে চলবে না, তাদের সাথে একটি শক্তিশালী মানসিক সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা যখন কোনো ধরণের হুমকি বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হবে, তখন তারা যেন ভয়ে গুটিয়ে না গিয়ে, সবার আগে মা-বাবার কাছে এসে সাহায্য চাইতে পারে এমন একটি “আস্থাভিত্তিক পরিবেশ” তৈরি করা প্রয়োজন। পরিবারে প্রথম পরিবর্তনটি আসতে হবে মনস্তাত্তি¡ক স্তরে; সন্তানকে শাসনের বেড়াজালে না রেখে এমন এক আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা দরকার, যেন যেকোনো সংকটে তার প্রথম আশ্রয়স্থল হয় তার মা-বাবা।
জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক প্রতিরোধ গবেষণা দেখায়, সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ আসে তিনটি স্তর থেকে: পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এই তিনটি স্তর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজকাল কেবলই জিপিএ-৫ কিংবা একাডেমিক ফলাফলের ইঁদুরদৌড়ে ব্যস্ত, অথচ সেখানে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মরক্ষা কিংবা ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ ও সুরক্ষার মতো মৌলিক সচেতনতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চর্চাও নেই। স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে ‘চাইল্ড সাইকোলজিস্ট’ বা কাউন্সেলর রাখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি আজও আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, আমাদের কমিউনিটি বা চেনা সামাজিক প্রতিবেশের সেই একাত্মতাও এখন বিলুপ্তপ্রায়, যেখানে প্রতিবেশীর সন্তানের যেকোনো অস্বাভাবিকতা বা বিপদে মানুষ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসত। এমনকি আমাদের চার দেয়ালের ভেতরে থাকা শিশু গৃহকর্মী বা প্রান্তিক শিশুরা যখন অদৃশ্য নির্যাতনের শিকার হয়, সমাজ তখন চোখ বুজে থাকে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদাসীনতার কারণেই বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার আইনি ও কাঠামোগত ব্যবস্থাগুলো থাকা সত্তে¡ও তার সুফল মিলছে না। আমাদের দেশে শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে ‘শিশু আইন, ২০১৩’ রয়েছে, শিশুদের তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য সরকারের ১০৯৮ চাইল্ড হেল্পলাইন এবং জরুরি সেবার জন্য ৯৯৯-এর মতো প্ল্যাটফর্ম কার্যকর রয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বলছে, এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে প্রান্তিক বা সাধারণ স্তরের মানুষের সচেতনতা এখনো অনেক কম।
সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো আমাদের ধীর বিচার প্রক্রিয়া। ‘বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকলেও বিচারিক প্রক্রিয়ার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বছরের পর বছর হাজার হাজার মামলা ঝুলে থাকে, যেখানে অপরাধীদের শাস্তির বা সাজার হার ৩ শতাংশেরও কম। আইনে বিচার সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থাকলেও বাস্তবে একেকটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে প্রায় পৌনে ৪ বছর (১,৩৭০ দিন) লেগে যাচ্ছে। এই সুদীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীরা একপর্যায়ে আদালতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, যার সুযোগ নিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলাতেই আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। তদন্তের দুর্বলতা, সঠিক সময়ে ফরেনসিক বা মেডিকেল রিপোর্ট না পাওয়া এবং সামাজিক ও মানসিক চাপের মুখে ভুক্তভোগী পরিবারের আপস করতে বাধ্য হওয়াই সাজার হার এত নিচে নেমে আসার প্রধান কারণ। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাজার এই হতাশাজনক হার মামলার সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।
এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের মনে এক ধরণের অভয় ফায়দা তৈরি করে যে কিছুদিন ফেসবুকে আলোচনা হবে, মোমবাতি জ্বলবে, তারপর নতুন কোনো খবরে সবাই সব ভুলে যাবে। ফলে আইন কিংবা সরকারি হেল্পলাইন থাকার পরেও অপরাধের শিকার হওয়া সিংহভাগ ব্যবস্থাপনাই শেষ পর্যন্ত ঘটনার পরে ‘প্রতিক্রিয়া’ দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়; ঘটনার আগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
একটি সমাজের পরিপক্বতা কেবল তার ক্ষোভ প্রকাশের তীব্রতায় নয়, বরং ভুল থেকে শেখার ক্ষমতায় প্রকাশ পায়। প্রতিটি ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে একটি কঠিন সুযোগ এনে দেয়। আমরা চাইলে শুধু সাময়িক শোক পালন করতে পারি, আবার চাইলে সেই শোককে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা বরাবরই প্রথম কাজটি বেছে নিই।
রামিসার ঘটনা নিয়ে আলোচনাও হয়তো একসময় স্তিমিত হয়ে আসবে। সংবাদ শিরোনাম বদলাবে, জনমতের কেন্দ্রও অন্যদিকে সরে যাবে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই এই ক্ষতি থেকে শিক্ষা নিতে চাই, তবে আলোচনাকে তাৎক্ষণিক আবেগের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের শুধু কী ঘটেছিল তা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না; খুঁজতে হবে কেন ঘটেছিল এবং ‘ভবিষ্যতে কীভাবে এটি রোধ করা যায়।
কারণ, প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর যদি আমরা একই প্রশ্ন করি, একই ক্ষোভ দেখাই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেদের না বদলাই তবে নির্মম সত্য এটাই যে, আমরা প্রতিবারই বড্ড দেরি করে ফেলছি। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ