খুলনা | রবিবার | ২১ জুন ২০২৬ | ৮ আষাঢ় ১৪৩৩

খুলনায় ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশে ডাঃ শফিকুর রহমান

আরেকটি ‘অনিবার্য বিপ্লবের’ প্রস্তুতি নিতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৩ এ.এম | ২১ জুন ২০২৬


বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডাঃ শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে এ বিষয়ে সমাধান না হলে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনগণের কাছে গিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরবেন। 
তিনি বলেন, “যেখানে কথা বলতে স্পিকারের অনুমতি প্রয়োজন হয় না, সেখানেই আমরা জনগণের সঙ্গে কথা বলব। দেশের মাঠে-ময়দানে গণজাগরণ সৃষ্টি হবে।” যুব সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আপনারা ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছেন। এখন নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানাতে প্রয়োজন হলে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকুন।” 
শনিবার বিকেলে খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অবঃ) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির  (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) যুগ্ম-সচিব এড. আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এড. এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক মোবারক হোসাইন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মোঃ ইজ্জত উল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি। 
অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন সমাবেশ জামায়াতের মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমীর উপাধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম মুকুল, বাগেরহাট জেলা আমীর মাওলানা রেজাউল করিম, ঝিনাইদহ জেলা আমীর আলী আজম মোঃ আবু বক্কর এমপি, যশোর জেলা আমীর অধ্যাপক মোঃ গোলাম রসূল এমপি, মেহেরপুর জেলা আমীর মাওলানা তাজ উদ্দিন খান এমপি, নড়াইল জেলা আমীর মোঃ আতাউর রহমান বাচ্চু এমপি, লেবার পার্টির মহানগরী সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ সাইফুদ্দোহা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের খুলনা জেলা সভাপতি মুফতী শরীফ সাঈদুর রহমান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) যুগ্ম-সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আবু বক্কার সিদ্দিক মোড়ল, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য মোঃ জাকির হোসেন খান, খেলাফত মজলিসের মহানগর সভাপতি এফ এম হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মোঃ ইব্রাহিম খলিল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) খুলনা মহানগর সভাপতি এড. মোঃ হানিফ উদ্দীন। জামায়াতের মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকের অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। এর আগে দুপুর ১২টা থেকে প্রেরণা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ খুলনার শিল্পীবৃন্দ ইসলামী সংগীত পরিবেশন করেন।
ডাঃ শফিকুর রহমান আরও বলেন, দেশের মানুষ বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশায় পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ ও দুর্বল করার মাধ্যমে জনগণের অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে।
ডাঃ শফিকুর রহমান বলেন, তাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়; বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি বলেন, “আমরা দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না। কিন্তু অন্যায়, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যবাদেও কাছে মাথা নত করব না।”
সীমান্ত পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে দেশের জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করবে। কোনো বিদেশি আধিপত্য বা আগ্রাসনের সামনে বাংলাদেশ মাথা নত করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুব সমাজের প্রতি আহŸান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপনারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। দেশের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।” তবে তিনি বলেন, এই বিপ্লব কোনো দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য নয়; বরং দুর্নীতি, বৈষম্য, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তিনি একটি দুর্নীতিমুক্ত, চক্রান্তমুক্ত, দলীয় প্রভাবমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গঠার আহŸান জানিয়ে বলেন, দেশের যুব সমাজকে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে।
সভাপতির বক্তৃতায় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় জোটের খুলনা বিভাগীয় সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার তা থেকে সরে এসেছে। গণভোটে জনগণ যে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণভোটে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। অথচ বর্তমানে সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে সরকার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে জনসমুদ্র : গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন দাবিতে খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস ময়দানের ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বেলা ২টায় এ সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর ১২টা থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়। এই সমাবেশকে ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই খুলনামুখী মিছিল আর স্লোগানে সার্কিট হাউজ ময়দান জুড়ে সৃষ্টি হয় জনসমুদ্রের। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। সব মিলিয়ে খুলনা বিভাগীয় সমাবেশকে ঘিরে নগর জুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সমাবেশ শেষ হলে শহরে জনস্রোত তৈরি হয়।সমাবেশের মূল কার্যক্রম শুরু হওয়ার ছিল দুপুর ২টা থেকে। তবে দুপুর ১২টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাবেশের সূচনা হয়। নাজমুল কবীরের উপস্থাপনায় প্রেরণা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ খুলনার শিল্পীদের পরিবেশনায় জমে ওঠে প্রথম পর্ব। এরপর একে একে বিভিন্ন বিভাগের সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয় আয়োজনে।
মঞ্চ নির্মাণ, অতিথিদের আসন, মাইকসহ অন্যান্য লজিস্টিক প্রস্তুতি মধ্যরাতেই সম্পন্ন হয়। সার্কিট হাউজ ময়দানে উড়ানো হয় ১১ দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ লেখা বেলুন। মঞ্চে টানানো ব্যানারে লেখা ‘খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ’। লাল কার্পেট ও অস্থায়ী ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয় দেড় শতাধিক অতিথিদের জন্য আসন। মূল মঞ্চের আশপাশে রাখা হয় ১১ দলের খুলনা বিভাগের ১০ জেলার প্রতিনিধিসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য আসন।
খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা থেকে পাঁচ সহস্রাধিক বাস, ট্রাক, ট্রেন ও ট্রলারযোগে দলে দলে নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই খুলনায় এসে পৌঁছাতে শুরু করেন। মিছিলের পর মিছিল আসতে থাকে গল্লামারী, জোড়াগেট, জেলখানাঘাট, রূপসাঘাট হয়ে সার্কিট হাউজ ময়দানে। প্রতিটি মিছিলে বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত ফেস্টুন, ব্যানার  বহন করতে দেখা গেছে। কেউ জাতীয় পতাকা, কেউবা দলীয় মনোগ্রাম খচিত গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি পরে অংশ নেন।
১১ দলের নেতারা জানান, এই জনসমাবেশ খুলনার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতীয় নির্বাচনের পর খুলনায় বিরোধী জোটের স্মরণকালের বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। বিশেষ করে সংসদের বিরোধী জোটের অবস্থান, বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের প্রতি সমালোচনা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই সমাবেশ থেকে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনেও সমাবেশটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মোবারক হোসাইন বলেন, আল্লাহর রহমতে অনুকুল আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে বিভাগীয় সমাবেশ সর্বাত্মকভাবে সফল হয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা ও উপজেলা থেকে ১১ দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণে সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ