খুলনা | বুধবার | ২৪ জুন ২০২৬ | ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

নেতৃত্বশূন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় : ক্ষতি শিক্ষার্থীদের, দ্রুত সংকট সমাধান কাম্য

|
১২:৩৮ এ.এম | ২৪ জুন ২০২৬


শিক্ষকদের গ্র“পিং ও মামলার কারণে দেশের অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে প্রাথমিক শিক্ষায় এই যে বিশৃঙ্খলা চলছে, তার ভুক্তভোগী হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের ভূমিকা শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং একজন প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক হিসেবেও। ফলে বনিয়াদি শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলো নেতৃত্বশূন্য থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গিয়েই পড়ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার ৪৫৭। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই; অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকসংকটের এই প্রভাব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে পড়ছে, প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে।    
খবর জানাচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই সংকটের সূত্রপাত হয়েছে ২০১৩ সালে ২২ হাজার ৯২৫টি রেজিস্টার্ড বেসরকারি বিদ্যালয়কে সরকারি করার পর। প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশ মামলা করার পর আদালত স্থগিতাদেশ দেন। ফলে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় দেরি, পদোন্নতিতে ধীরগতির কারণে এই সংকট আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদে ২০ শতাংশ সরাসরি পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগের বিধান থাকলেও প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষকের নিয়োগপ্রক্রিয়া মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আটকে গেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষক সংগঠনগুলোর বিভক্তি ও নেতৃত্বের দ্ব›দ্ব এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রায় ২৩টি সংগঠন রয়েছে। একই পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দাবি-দাওয়া আদায়ে এতগুলো সংগঠন থাকাটা বিস্ময়ের। অভিযোগ আছে, অনেক সংগঠনের নেতৃত্ব শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তাঁদের কেউ কেউ বিদ্যালয়ে ঠিকমতো উপস্থিতও থাকেন না। শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পরিবর্তে যদি সংগঠনগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত থাকে, তবে তার খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।
দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। বনিয়াদি এই স্তরে শিক্ষার্থীদের শেখার ভিত কতটা শক্ত হচ্ছে, তার ওপর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সৃজনশীলতা, দক্ষতা নির্ভর করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখনঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠে। গণিত, ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক শূন্য থাকায় শিক্ষার মান নিঃসন্দেহে কমছে।
আমরা মনে করি, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, দ্রুত তার অবসান হওয়া প্রয়োজন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শিক্ষক সংগঠনগুলোকে অবশ্যই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক সংগঠনগুলোর মনে রাখা প্রয়োজন যে শিক্ষার্থীরা তাদের গ্র“পিং, নেতৃত্বের দ্ব›দ্ব কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের বলি হতে পারে না। এখানে সরকার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। ১৩ বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সেদিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে পদোন্নতি দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ