খুলনা | বুধবার | ২৪ জুন ২০২৬ | ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

পুনরায় দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ # তদন্ত নেমেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক

ফ্যাসিস্ট সিন্ডিকেটের দখলে খুলনার ওএমএস সেক্টর!

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০২:৫৬ এ.এম | ২৪ জুন ২০২৬


গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারে পতন হলেও এখনো আওয়ামী সিন্ডিকেটের দখলে রয়েছে খোলা বাজারে সরকারের চাল-আটা বিক্রয় কেন্দ্র ওএমএস সেক্টর। নগরীর ৩১ ডিলারের মধ্যে ২০ জনই জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদধারী নেতাকর্মী ও দোসর। আবার একাধিক নেতার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজনদের নামে রয়েছে একাধিক লাইসেন্স। এভাবে সংখ্যায় বেশি থাকায় আওয়ামী পন্থিদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে অবৈধ শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার করেছে খোদ সরকারি খাদ্য অফিসে। জনশ্র“তি রয়েছে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাযশে অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত চাল-আটার অর্ধেক অংশ চলে যাচ্ছে কালো বাজারে। ফলে একদিকে যেমন সরকারের এই মহতী উদ্যোগ হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে অন্যদিকে সল্প মূল্যের খাদ্য পণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ। এদিকে দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগে সাংবাদিক নামধারী আওয়ামী লীগ নেতার নিজ নামীয় লাইসেন্সসহ তার নিয়ন্ত্রণাধীন ৫টি লাইসেন্স বাতিল আদেশ বাস্তবায়ন না হলেও দীর্ঘ ৬ বছর পর একই অভিযোগে পুনরায় তদন্তে নেমেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা যায়, ৫টি ওএমএস লাইসেন্সের মালিকানার অস্থিত্ব না থাকায় এবং খাদ্য পন্য কালাবাজারে বিক্রয়ের অভিযোগে বিগত ৫ মে ২০২০ সালে খুলনার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি রিপোর্ট পেশ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে মেসার্স সুলতানা এন্টারপ্রাইজ, এস এম এন্টারপ্রাইজ, রুবেল এন্টারপ্রাইজ, নির্মান এন্টারপ্রাইজ ও জোহরা এন্টারপ্রাইজ নামে ৫টি ওএমএস ডিলার লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, ওএমএস ডিলার সাঈয়েদুজ্জামান সম্রাটের বিরুদ্ধে ওএমএস পণ্য বিক্রির অনিয়মের প্রেক্ষিতে উলে­খিত ৫টি লাইসেন্সে বাতিলের সুপারিশ করা হয়। তদন্ত কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুব আলী। কমিটির সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ, দুর্নীতি দমন খুলনার উপ-পরিচালক নাজমুল হাসান, খুলনা প্রেসক্লাবের প্রতিনিধি সুনীল দাস এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর আলম। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে বিভাগীয় কমিশিনার এবং ওএমএস কমিটির সভাপতি মোঃ মাহাবুবুর রহমান অভিযুক্ত ৫টি লাইসেন্স বাতিল ঘোষনা করে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবগত করেন।
এদিকে ২০২০ সালে অভিযুক্ত ৫টি ওএমএস লাইসেন্স বাতিল করা হলেও অদৃশ্য শক্তির এশারায় আজও বহালতবিয়তে ব্যবসা চলছে ওই লাইসেন্স দিয়ে। উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের তৎকালিন এক কর্মকর্তার সাথে যোগসাযসে লাইসেন্সগুলি পুনরায় বহাল করা হয় বলে জানা যায়।
এদিকে পুনরায় অভিযুক্ত ৫টি লাইসেন্সে বিরুদ্ধে আবারও তদন্তে নেমেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখ জেলার সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক বনী আমিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ২১ জুন তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত ৫ লাইসেন্সধারীকে তদন্ত টিমের মুখোমুখি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এবারো কি পার পেয়ে যাবে দুনীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা সাঈয়েদুজ্জামান সম্রাট এমন প্রশ্ন ভুক্তভোগী মহলের।
সূত্রমতে সরকার খুলনা মহানগরীর হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা বিক্রয় করে। ৩০ টাকা প্রতি কেজি চাল ও ২৪ টাকা প্রতি কেজি আটা বিক্রয় করা হয়। জনপ্রতি সর্ব্বোচ্চ পাঁচ কেজি চাল ও পাঁচ কেজি আটা কিনতে পারবেন। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ৩১ জন ডিলারের মাধ্যমে চাল-আটা বিক্রি করা হয়। সরকার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ ও মাঠপর্যায়ে বিক্রয় কার্যক্রম সরাসরি তদারকী করে থাকে।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে মোট ডিলার ছিলো ৭৩ জন। অন্তর্বতী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগকৃত ৭৩ জন ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করে লটারির মাধ্যমে নতুন ডিলার নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে পরিপত্র জারি করে। যদিও সরকার লটারীর মাধ্যমে ১২ জন ডিলার নিয়োগ দেয়, এবং আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগকৃত বাকি ১৯ জন উচ্চ আদালতের এক আদেশের মাধ্যমে তাদের লাইসেন্সের কার্যক্রম বহাল রাখে। এই ১৯ জন ডিলারের প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের দলীয় পদধারী।
খুলনার ওএসএস সেক্টর বর্তমানে এই ১৯ জনের সিন্ডিকেট বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এদের অধিকাংশ নিয়ম বহির্ভূত ভাবে নিজের নামসহ পরিবারের একাধিক সদস্যদের নামে একাধিক লাইসেন্স পরিচালনা করছে। যদিও নিয়ম বহির্ভূত তবুও খাদ্য দপ্তরের কতিপয় অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজসে এধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন যাবত চলে আসছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় এই সিন্ডিকেট প্রধান খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাইয়্যেদুজ্জামান মোল­া সম্রাটের নিজ নামীয় প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুলতানা এন্টারপ্রাইজ। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরও পাঁচটি লাইসেন্স, যার মধ্যে তার ছোট ভাই এমডি ওয়াহিদুজ্জামানের নামের প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এম এন্টারপ্রাইজ, মামি নিশাথ পারভিনের নামে মেসার্স রুবেল স্টোর, গ্রাম্য আত্মিয় আসাদুজ্জামান শেখের নামে মেসার্স আসাদ স্টোর ও জোহরা এন্টারপ্রাইজ এবং  মেসার্স নির্মাণ এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগ রয়েছে মেসার্স আসাদ ষ্টোর এবং মেসার্স জোহরা এন্টারপ্রাইজ এর মালিকের ভোটার আইডিকার্ড নড়াইলের ঠিকানায়। যা খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়ম বহির্ভূত।
সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন, সোনাডাঙ্গা থানার যুবলীগের আহবায়ক সালাম ঢালীর প্রতিষ্ঠান সালাম এন্টারপ্রাইজ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি রাসেল ভুলুর প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাসেল এন্টারপ্রাইজ, মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি লিভানা পারভিনের প্রতিষ্ঠান লিভানা এন্টারপ্রাইজ, মহিলা নেত্রী মঞ্জুয়ারা লাভলীর প্রতিষ্ঠান মেসার্স মঞ্জুয়ারা এন্টারপ্রাইজ, সাবেক এমপি এস এম কামালের এপিএস কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক শেখ ইমনের প্রতিষ্ঠান অথৈই এন্টারপ্রাইজ, খালিশপুর থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শার্মিন রহমান শিখার প্রতিষ্ঠান মেসার্স রমজান এন্টারপ্রাইজ ও তসলিমা এন্টারপ্রাইজ, আওয়ামী লীগ নেতা বিদ্যুৎ রায়ের প্রতিষ্ঠান মেসার্স কণিকা এন্টারপ্রাইজ, যুবলীগ নেতা গোলাম মোর্শেদের প্রতিষ্ঠান মেসার্স কাস্ফিয়া এন্টারপ্রাইজ। এছাড়াও বিভিন্ন ভুয়া নামের প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ নেতারা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাঈয়েদুজ্জামান সম্রাট দলীয় পদ স্বীকার করে বলেন, আমার নামে একাধিক লাইসেন্স থাকার সুযোগ নেই। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ব্যাপারে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও তদন্ত কমিটির আহবায়ক বনী আমিন বলেন, ‘অভিযোগের বিরুদ্ধ তদন্ত চলছে । তদন্ত শেষে রির্পোট দেওয়া হবে। এখন কিছু বলা যাবে না।’

প্রিন্ট

আরও সংবাদ