খুলনা | শুক্রবার | ২৬ জুন ২০২৬ | ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩

ভাঙন ঝুঁকিতে দক্ষিণ উপকূলের শত কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:০৯ এ.এম | ২৬ জুন ২০২৬


বর্ষা শুরু হতেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের চিরচেনা আতঙ্ক ভেড়িবাঁধ ভাঙন। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীব্র স্রোত ও জোয়ারের চাপে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে শতাধিক কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ। কোথাও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল, কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাঁধের অংশ। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানিতে প্লাবিু হতে পারে বিস্তীর্ণ জনপদ এমন আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে নদীপাড়ের হাজারো মানুষের।
খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া নদীর তীরে এখন আতঙ্কই যেন নিত্যসঙ্গী। নদীর পাড় ঘেঁষে ভাঙছে বেড়িবাঁধ। বর্ষার ঢেউ আর জোয়ারের চাপে প্রতিদিনই বাড়ছে ঝুঁকি। বাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের সুরে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া বেগম। গত পাঁচ বছরে তিন দফা নদীভাঙনে তিনি হারিয়েছেন নিজের বসুভিটা। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মুখে তার পরিবার। 
রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আগের ভাঙনে সব হারাইছি। অনেক কষ্টে আবার ঘর তুলছি। এখন আবার বাঁধ ভাঙতেছে। রাত হলেই ভয় লাগে, কখন কী হয়।’
শুধু পানখালী নয়, দাকোপ উপজেলার জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষীখোলা ও নলডাঙ্গাসহ অন্তত ১০টি পয়েন্টে অব্যাঘু রয়েছে ভাঙন। এছাড়া পাইকগাছার দেলুটি ও লতা ইউনিয়ন, কয়রার মহেশ্বরীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রয়েছে। 
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, ‘জোয়ারের সময় ঘুম আসে না। বাঁধ ভেঙে গেলে ঘের, জমি, বাড়িঘর সব শেষ হয়ে যাবে। তাই প্রায়ই রাত জেগে বাঁধের অবস্থা দেখতে হয়। একই ধরনের শঙ্কার কথা জানালেন পানখালীর আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আইলা আর আম্পানের সময় যা কষ্ট হইছে, তা এখনো ভুলতে পারি না। আকাশে মেঘ দেখলেই ভয় লাগে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই স্থানে ভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। সাময়িক মেরামতের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরর্বুী বর্ষায় আবারও দেখা দেয় একই সমস্যা। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমই তাদের কাছে নতুন দুর্যোগের বার্তা নিয়ে আসে।
খুলনার পাশাপাশি বাগেরহাটের শরনখোলা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই দুই জেলায় আরও ৬০ কিলোমিটারের বেশি ভেড়িবাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। 
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, উপক‚লীয় এলাকার বাস্তবুা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন না করায় অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জলবায়ু পরির্বুনের ফলে জলোচ্ছ¡াস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই উপক‚ল সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি টেকসই ও স্থায়ী ভেড়িবাঁধ নির্মাণে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় তাদের আওতায় প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ রয়েছে। এর একটি বড় অংশ নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। 
প্রতি বছর উপক‚ল রক্ষায় নেয়া হয় নতুন নতুন প্রকল্প, ব্যয় হয় শত শত কোটি টাকা। কিন্তু নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই, এই বর্ষায় বাঁধ টিকবে তো? কারণ বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু মাটি বা ইটের কাঠামো ভাঙে না, ভেঙে পড়ে মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা আর নিরাপত্তাবোধও। তাই সাময়িক সংস্কারের গন্ডি পেরিয়ে উপক‚লের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি টেকসই, কার্যকর ও স্থায়ী ভেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দুর্ভোগের এই চক্র থেকে মুক্তি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ