খুলনা | রবিবার | ২৮ জুন ২০২৬ | ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

উব্দোধন করলেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম

জোয়ার-ভাটার অপেক্ষার অবসান, মোংলা নদীতে ২৪ ঘণ্টার ফেরি চলাচল শুরু

মোংলা প্রতিনিধি |
১১:২৬ পি.এম | ২৭ জুন ২০২৬


দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মোংলা নদীতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ২৪ ঘণ্টার ফেরি সার্ভিস। পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম শনিবার (২৭ জুন) সকালে নতুন ফেরির উদ্বোধন ও ২৪ ঘণ্টার ফেরি সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপরই নতুন ফেরিসহ দুটি ফেরি দিয়ে দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে পারাপার কার্যক্রম শুরু হয়। এর ফলে জোয়ার-ভাটার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে আটকে থাকার দুর্ভোগ থেকে স্বস্তি মিলবে বলে আশা করছেন সাধারণ যাত্রী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, মোংলা নদীর এই ফেরিঘাট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড, শিল্পকারখানা এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ এই ফেরিঘাট ব্যবহার করেন। নাব্যতা সংকটের কারণে এতদিন জোয়ারের সময় ছাড়া ফেরি চলাচল সম্ভব হতো না। ফলে দিনের বড় একটি সময় ফেরি বন্ধ থাকত। জোয়ারের অপেক্ষায় ফেরিঘাটে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকত পণ্যবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স, বাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল। শত শত যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো নদী পার হওয়ার জন্য।

বিশেষ করে মোংলা ইপিজেড ও বন্দরের ১৫ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রতিদিন সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তির শিকার হতেন। অনেকে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে নদী পার হতেন। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়তেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকেও ফেরির অপেক্ষায় আটকে থাকতে হয়েছে বহুবার।

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানে মোংলা-ঘাষিয়াখালী নৌচ্যানেলে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নদীর নাব্যতা বাড়ায় এখন ভাটার সময়ও ফেরি চলাচল সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন একটি ফেরি যুক্ত হওয়ায় এখন দুটি ফেরি পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা চলাচল করবে। এতে নদী পারাপারে সময় যেমন কমবে, তেমনি মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইপিজেডের শ্রমিক সোহেল রানা বলেন, আগে ডিউটিতে যেতে প্রায়ই ফেরিঘাটে আটকে থাকতে হতো। অনেক সময় দেরি হওয়ায় হাজিরা ও বেতনেও প্রভাব পড়ত। এখন যে কোনো সময় ফেরি পাওয়া গেলে আমাদের কর্মজীবন অনেক সহজ হবে।

সাধারণ যাত্রী রহিমা বেগম বলেন, আগে জোয়ার না এলে কোনো উপায় ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। আমরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে ট্রলারে করে পার হতাম। ট্রলারে প্রায়ই ঘটতো দুর্ঘটনা। এখন ২৪ ঘণ্টা ফেরি চললে আমাদের অনেক কষ্ট কমে যাবে।

মোংলার ব্যবসায়ী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্দরনির্ভর ব্যবসার জন্য এই ফেরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পণ্য পরিবহন করা গেলে ব্যবসার গতি বাড়বে এবং অতিরিক্ত খরচও কমবে। এখানে ফেরী চলাচল নিয়মিত রাখতে হবে। ট্রাকচালক আবুল কালাম বলেন, আগে একটি ট্রিপ শেষ করতেই অনেক সময় নষ্ট হতো। এখন রাতেও ফেরি চলবে, তাই কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তবে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এ নদীর নাব্য ধরে রাখার দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইপিজেডের আরেক শ্রমিক মাহবুবুল আলম বলেন, যে সুবিধা চালু হয়েছে তাতে আমাদের দুই পাড়ের মানুষের অনেক উপকার হয়েছে। তবে এই সুবিধা ধরে রাখেতে হবে। এ জন্য নদী খনন নিয়মিত করতে হবে। নিয়মিত নদী খনন না করা গেলে এই সুবিধা আবার বন্ধ হয়ে যাবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে বছরের পর বছর মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ফেরি চলাচল জোয়ারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় সাধারণ যাত্রী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। সরকার সেই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানে নদীতে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে ড্রেজিংয়ের সুফল পাওয়া গেছে এবং এখন ২৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল সম্ভব হচ্ছে। এই নাব্যতা ধরে রাখতে প্রতি দুই মাস পরপর প্রয়োজনীয় ড্রেজিং করা হবে, যাতে ফেরি চলাচল কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে মোংলা নদীর ওপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ