খুলনা | শনিবার | ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

তাওবা কবুল হওয়ার শর্তসমূহ

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০২:১৬ এ.এম | ০৩ জুলাই ২০২৬


মানুষ ভুল-ত্র“টির ঊর্ধ্বে নয়। শয়তানের প্ররোচনা, প্রবৃত্তির তাড়না কিংবা অসতর্কতার কারণে মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। তবে মহান আল্লাহ তা’য়ালার অসীম দয়ার অন্যতম প্রকাশ হলো, তিনি তাওবার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। বান্দা যখন আন্তরিক ভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে তাঁর দিকে ফিরে আসে, তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে তাওবা শুধু মুখের কিছু শব্দ উচ্চারণের নাম নয়; বরং এর কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ হলেই তাওবা প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আশা করা যায়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা মহান আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো। আশা করা যায়, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।” (সুরা আত-তাহরিম: ৮)
তাওবার প্রথম শর্ত হলো একনিষ্ঠতা। মহান আল্লাহ তা’য়ালার ভালোবাসা, তাঁর মহত্তে¡র প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁর রহমতের আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয়কে সামনে রেখে তাওবা করতে হবে। তাওবার উদ্দেশ্য কখনো পার্থিব স্বার্থ, মানুষের প্রশংসা বা অন্য কোনো লাভ-লোকসান হতে পারে না। যদি কেউ কেবল কোনো বিপদ দূর করার জন্য, মানুষের কাছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করার জন্য কিংবা কোনো জাগতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাওবা করে, তাহলে তার তাওবার আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। প্রকৃত তাওবা সেই তাওবা, যা কেবল মহান আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হয়।
দ্বিতীয় শর্ত হলো কৃত গুনাহের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা। গুনাহের স্মরণে হৃদয় ব্যথিত হওয়া, নিজের অপরাধ উপলব্ধি করা এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার সামনে নিজেকে লাঞ্ছিত ও অসহায় মনে করাই প্রকৃত অনুতাপ। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “অনুশোচনাই তাওবা।” (ইবন মাজাহ) অর্থাৎ অন্তরে যদি অনুতাপ সৃষ্টি না হয়, তবে তাওবার প্রাণশক্তিই অনুপস্থিত থাকে।
তৃতীয় শর্ত হলো অবিলম্বে গুনাহ পরিত্যাগ করা। যে ব্যক্তি তাওবা করছে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে সেই গুনাহ থেকে বিরত হতে হবে। যদি অপরাধ কোনো নিষিদ্ধ কাজ করার মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে তা তৎক্ষণাৎ বর্জন করতে হবে। আর যদি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব কাজ পরিত্যাগ করার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে যথাসম্ভব দ্রুত তা আদায় বা কাযা করতে হবে। যেমন নামাজ, যাকাত বা হজের মতো দায়িত্ব অবহেলা করা হয়ে থাকলে তা পূরণের চেষ্টা করতে হবে।
গুনাহ যদি মানুষের অধিকার সম্পর্কিত হয়, তাহলে শুধু মুখে তাওবা করলেই যথেষ্ট নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কেউ অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকলে তা মালিককে ফেরত দিতে হবে। মালিক মৃত্যুবরণ করলে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। যদি তাদের সন্ধান না পাওয়া যায়, তাহলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তা জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করতে হবে। একই ভাবে কারও সম্মানহানি, অপবাদ বা গিবতের মাধ্যমে অন্যায় করা হলে যথাসম্ভব তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
চতুর্থ শর্ত হলো দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা যে, ভবিষ্যতে আর সেই গুনাহে ফিরে যাওয়া হবে না। মানুষ দুর্বলতার কারণে পরবর্তীতে আবারও গুনাহে জড়িয়ে পড়তে পারে; কিন্তু তাওবার সময় তার আন্তরিক নিয়ত থাকতে হবে যে, সে আর এ পথে ফিরবে না। যদি কেউ তাওবার সময়ই মনে মনে পরিকল্পনা করে যে, সুযোগ পেলে আবারও একই কাজ করবে, তাহলে তার তাওবা প্রকৃত তাওবা হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ দৃঢ় সংকল্প তাওবার সত্যতার অন্যতম প্রমাণ।
পঞ্চম শর্ত হলো তাওবা গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই তাওবা করা। তাওবার সুযোগ চিরকাল খোলা থাকবে না। এ সময়সীমা দুইভাবে শেষ হয়। প্রথমত, সমগ্র মানবজাতির জন্য যখন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবে। কিয়ামতের এই মহা নিদর্শন প্রকাশ পাওয়ার পর আর তাওবা গ্রহণ করা হবে না। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার আগে তাওবা করবে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার তাওবা কবুল করবেন।” (মুসলিম)
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তাওবার সুযোগ শেষ হয়ে যায়। মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে এবং পরকালের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ হয়ে পড়লে তাওবা আর গ্রহণযোগ্য থাকে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, “তাদের জন্য তাওবা নয়, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলেÑআমি এখন তাওবা করছি।” (সুরা আন-নিসা: ১৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার তাওবা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করেন, যতক্ষণ তার প্রাণ কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছেনি।” (তিরমিজি)
তাওবার ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গুনাহকে গোপন রাখা। আজকাল অনেকেই অতীতের পাপকে গল্প বা অভিজ্ঞতা হিসেবে মানুষের সামনে প্রকাশ করে থাকেন, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত। মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন কোনো বান্দার গুনাহ গোপন রাখেন, তখন তারও উচিত তা গোপন রাখা এবং একান্তে মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার উম্মতের সকলকে ক্ষমা করা হবে, তবে প্রকাশ্যে গুনাহকারীরা ছাড়া। প্রকাশ্যে গুনাহ করার একটি রূপ হলো, কোনো ব্যক্তি রাতে একটি গুনাহ করল, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তা গোপন রাখলেন; কিন্তু সকালে সে নিজেই বলে বেড়াল, আমি গত রাতে এই এই কাজ করেছি। এভাবে সে মহান আল্লাহ তা’য়ালার গোপন করে রাখা বিষয় নিজেই প্রকাশ করে দিল।” (বুখারি)
তাওবা একজন মুমিনের জীবনে নতুন সূচনার নাম। এটি হতাশা থেকে আশার পথে, গুনাহ থেকে আনুগত্যের পথে এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার অসš‘ষ্টি থেকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ফিরে আসার এক মহামূল্যবান সুযোগ। তাই বিলম্ব না করে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আন্তরিকতার সঙ্গে তাওবা করা এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ওপর অবিচল থাকা। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে খাঁটি তাওবা করার, তা কবুল হওয়ার শর্তগুলো পূরণ করার এবং তাঁর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন। 
লেখক: বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ১৫ দিন আগে

ইসলাম

প্রায় ২১ দিন আগে