খুলনা | শনিবার | ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায়, জানাজা আজ

আয়াতুল্লাহ খামেনির অন্তিম যাত্রায় শোকার্ত ইরান

খবর প্রতিবেদন |
০১:২৮ এ.এম | ০৪ জুলাই ২০২৬


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রয়াণে এখন শোকার্ত ইরান। গত ফেব্র“য়ারিতে মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর, বর্তমানে তেহরানের বিশাল প্রার্থনা হলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার মরদেহ শায়িত রাখা হয়েছে। দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনামলের সমাপ্তি ঘটিয়ে এই মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এক গভীর সংকটের মুহূর্ত তৈরি করেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ এখন এক আবেগঘন যাত্রার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুক্রবার তেহরানের প্রার্থনা হলে হাজার হাজার শোকার্ত সমর্থক তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনের পাশে রাখা হয়েছিল তার কালো পাগড়ি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত চেকর্ড স্কার্ফ। এই আয়োজনে যোগ দিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি এবং চীনের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদলসহ বিশ্বনেতারা।
কর্তৃপক্ষ এই শেষ বিদায়কে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইরান এবং ইরাকের শিয়া পবিত্র শহর কোম, নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রা শেষে আগামী বৃহস্পতিবার মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাকে সমাহিত করার কথা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তার খাতিরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল আনুষ্ঠানিকতা কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে।
তবে এই শোকের আবহেও আড়াল হচ্ছে না ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার চিত্র। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমন গভীর বিভাজনের মুখে আগে কখনো পড়েনি। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, চরম মুদ্রাস্ফীতি এবং সা¤প্রতিক গণবিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানের ফলে নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশেষ করে, নিহত নেতার ছেলে এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে হামলার পর থেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা সত্তে¡ও, ইরান সরকার এই অনুষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। রাজধানী জুড়ে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’ সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। শিয়া ঐতিহ্যের ‘শহাদাত’ বা আত্মত্যাগের মহিমায় খামেনির এই মৃত্যুকে সাজিয়ে সরকার জনসাধারণের আবেগ ও সমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
খামেনির প্রয়াণ শুধু একজন নেতার মৃত্যু নয়, বরং এটি ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। একদিকে শিয়া ঐতিহ্যের এই শোকযাত্রা, অন্যদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, সব মিলিয়ে ইরান এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। তেহরানের রাজপথে কান্নার রোল আর বাতাসে বারুদের গন্ধ, সব মিলে এক ধূসর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দেশটি।
জানাজা আজ : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে আনা হয়েছে। সেখানে আজ শনিবার (৪ জুলাই) রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত জানাজায় কয়েক কোটি মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ খামেনির জানাজায় জনগণকে ব্যাপকভাবে উপস্থিত হওয়ার আহŸান জানিয়েছেন। তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।  
প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ইরানের ত্রিবর্ণ পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন শোকাহত মানুষ কাঁধে করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক ভেন্যু গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে যাচ্ছেন।
অন্য ছবিতে দেখা যায়, জানাজার আগের অনুষ্ঠানে কালো পোশাক পরা মানুষের ঢল। লাল ফুলের সাজসজ্জা ও বাতাসে ঝুলন্ত সাদা প্রজাপতির পটভূমিতে কফিনটি রাখা হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বন্ধে যখন একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে, তখন খামেনির জানাজার প্রস্তুতি চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানায়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
চীন, আফগানিস্তান এবং ককেশাস অঞ্চলে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও প্রতিনিধি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন কর্মীরা। নিরাপত্তা বাহিনী চলাচলকারী গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছিল। কৌতূহলী মানুষও সেখানে ভিড় করেন।
মাথায় টুপি ও মুখে স্কার্ফ জড়িয়ে কাজ করা কর্মী হোসেইন মোঘাদ্দাসি বলেন, ‘আমরা আমাদের শহীদ নেতার বিদায় অনুষ্ঠানের জন্য ফুলের গাছ লাগাচ্ছি ও গাছে পানি দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘ইরানের সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসবে। বিশাল জনসমাগম হবে।’
তেহরানের প্রধান আলোচক ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসে গৌরবময় একটি অধ্যায় রচনায় আমি সমগ্র ইরানি জনগণকে উপস্থিত থাকার আহŸান জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিশোধের জন্য জাতির আহŸান পুরো বিশ্বের কানে পৌঁছাতে হবে।’
অনেক শিয়া মুসলমানের আধ্যাত্মিক নেতা খামেনি রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে তাঁর কমপ্লেক্সে চালানো হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন।
তাঁর মরদেহ তিন দিন গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। বিশাল এ কমপ্লেক্সটি খামেনির ছবি ও উদ্ধৃতি সম্বলিত ব্যানারে সাজানো হয়েছে। হামলায় নিহত তাঁর স্বজনদের মরদেহও সেখানে রাখা হবে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, জানাজায় দেড় কোটি থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবে। সে ক্ষেত্রে এটি হবে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় জানাজা।
গালিবাফ একে ইরানের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অনুষ্ঠান চলাকালে তেহরানের পাশাপাশি পবিত্র নগরী কোম ও মাশহাদে সরকারি ছুটি থাকবে। এ দুই শহরে পরবর্তী ধাপের জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হবে।
কর্তৃপক্ষ শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে যান চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় শহরের কেন্দ্রের বড় অংশ ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য বিধিনিষেধ থাকবে। শুক্রবার থেকে তেহরানের আকাশসীমা আংশিক ও সোমবার পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
তেহরানের অনুষ্ঠান শেষে খামেনির মরদেহ ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে। এরপর ৯ জুলাই তার জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জনসমক্ষে না আসা খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতাবা খামেনি তেহরানের মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি।
প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধিদের জানাজায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে মানুষের ঢল নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই দাফন অনুষ্ঠান আলি খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনির অধীনে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। চার মাস আগে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। খামেনির শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
সাত দিনের কর্মসূচি : ইরান ও ইরাক জুড়ে সাত দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠান শুক্রবার তেহরানে শুরু হয়েছে। এদিনের কর্মসূচি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশ্বনেতা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং পণ্ডিতরা খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে জড়ো হয়েছেন।
আজ ও কাল : ৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বজনীনভাবে শোক পালন ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। শেষ বিদায় জানাতে সর্বসাধারণের জন্য পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের কফিনসহ খামেনির কফিন থাকবে গ্র্যান্ড মোসাল্লাতে। বিশাল জনসমাগমের জন্য নির্মিত গ্র্যান্ড মোসাল্লা ইরানের অন্যতম বৃহত্তম প্রার্থনা কেন্দ্র এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৬ ও ৭ জুলাই : জানাজার উদ্দেশ্যে শোকাহত ইরানিরা রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত কোমের দিকে অগ্রসর হবেন। কোম হলো ইরানের শিয়া ইসলামি পাণ্ডিত্যের প্রধান কেন্দ্র এবং অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে দেশটির বৃহত্তম মাদরাসাগুলো অবস্থিত।
৮ জুলাই : ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮ জুলাই নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এরপরে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
নাজাফের ইমাম আলি মাজার শিয়াদের জন্য অন্যতম পবিত্র স্থান, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লি আসেন। বিশ্বাস করা হয় যে, এখানে নবী মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাতা এবং শিয়া ইসলামের প্রথম ইমাম, ইমাম আলি ইবনে আবি তালিবের সমাধি রয়েছে।
কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন এবং আব্বাসের মাজার শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্রতম স্থান। এই স্থানেই ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইন এবং আব্বাস শহিদ হয়েছিলেন। আর এই ঘটনাটি শিয়া পরিচয় এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
৯ জুলাই : এরপর মরদেহটি চূড়ান্ত দাফন অনুষ্ঠানের জন্য ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ে দাফনের মাধ্যমে খামেনিকে শেষ বিদায় জানানো হবে। মাশহাদকে ইরানের পবিত্রতম শহর বলে মনে করা হয়। ইমাম রেজা ছিলেন শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ