খুলনা | সোমবার | ০৬ জুলাই ২০২৬ | ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

ভবন নেই, টয়লেট নেই, সীমানা প্রাচীরও নেই

চরম অবহেলায় মহাকবি মাইকেল মধুসূদনের স্মৃতিধন্য কাটীপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়

পাইকগাছা প্রতিনিধি |
১১:৪৩ পি.এম | ০৪ জুলাই ২০২৬


খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ঐতিহাসিক কাটীপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এখন চরম অবহেলা আর নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চলের গৌরবময় ঐতিহাসিক পটভূমি থাকা সত্তে¡ও দীর্ঘদিন ধরে এখানে লাগেনি কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তীব্র সংকটে পড়েছে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও শিক্ষা কার্যক্রম।
পাইকগাছার রাড়–লী ইউনিয়নকে বলা হয় গুণীদের উর্বর ভূমি। এখানেই জন্ম নিয়েছেন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আর এই মাটির আলো-বাতাসেই বড় হয়েছেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ইউনিয়নের কাটীপাড়ায় অবস্থিত কবির মামার বাড়ির দোল মন্দিরের গা ঘেঁষেই ১৯৮৬ সালে অমরনাথ বসু প্রতিষ্ঠা করেন ‘কাটীপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। বিদ্যালয়ের অনুকূলে তিনি ২ একর জমি দান করেন, যার পূর্ব মালিকানা ছিল কবির মামাদেরই। ১৯৮৬ সালে জুনিয়র পর্যায় দিয়ে শুরু হওয়া বিদ্যালয়টি ২০২২ সালের ৬ জুলাই মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। বর্তমানে এখানে ২৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ১৩ জন শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারী রয়েছেন।
২০১৫ সালে নির্মিত ৩ কক্ষের একটি একতলা ভবনই এখন বিদ্যালয়ের একমাত্র ভরসা। যার একটি কক্ষ ব্যবহৃত হয় দাপ্তরিক কাজে, আর বাকি মাত্র দু’টি কক্ষে চলে পাঠদান। শিক্ষার্থীর তুলনায় শ্রেণিকক্ষ অপ্রতুল হওয়ায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে বারান্দায় অথবা মাঠের পাশে অস্থায়ী টিনের ছাউনির নিচে ক্লাস নিচ্ছেন।
শ্রেণি শিক্ষক প্রমা ঘোষ বলেন শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে আমরা বাধ্য হয়ে বারান্দা ও টিনের ছাউনির নিচে ক্লাস নিই। এতে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। আর ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে তো ক্লাসই বন্ধ করে দিতে হয়। শুধু ভবনের অভাবই নয় বিদ্যালয়টির চারপাশ জুড়েই রয়েছে সমস্যার পাহাড়। কোনো বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় প্রতিনিয়ত বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত চলে, যা স্কুলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। এমনকি গবাদিপশু মাঠে ঢুকে পরিবেশ নোংরা করছে এবং গাছপালা নষ্ট করছে। ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো উন্নত ওয়াশ ব্লক। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন জানায়, মানসম্মত টয়লেট না থাকায় বিশেষ দিনগুলোতে ছাত্রীরা স্কুলে আসতেই পারে না। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও নেই কোনো বিশেষ সুবিধা।
ঐতিহাসিক এই বিদ্যাপীঠের এমন বেহাল দশায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সচেতন মহল। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী গোপাল দাশ ও সজীব বিশ্বাস জানায় মহাকবির স্মৃতিধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়তে পেরে তারা গর্বিত হলেও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় তারা দারুণভাবে হতাশ।
সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মোমিন সানা বলেন মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে যে বিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তা এভাবে অবহেলিত থাকতে পারে না। এর দ্রুত সামগ্রিক উন্নয়ন প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবশংকর রায় জানান স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য এখানে একটি বহুতল ভবন অত্যন্ত জরুরি। ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন, আমি একাধিকবার ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। এখানে নতুন ভবনের প্রয়োজনীয়তা আমি নিজেই অনুভব করেছি এবং বিষয়টি ঊধর্ক্ষতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ, সীমানা প্রাচীর ও উন্নত ওয়াশ ব্লক তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসী।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ