খুলনা | মঙ্গলবার | ০৭ জুলাই ২০২৬ | ২২ আষাঢ় ১৪৩৩

পৃথক রায়, গোপালগঞ্জ সহ পাঁচ জেলায় আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যায় মৃত্যুদন্ড ৯, যাবজ্জীবন ৪

খবর প্রতিবেদন |
০১:৩২ এ.এম | ০৭ জুলাই ২০২৬


দেশের ৫ জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার ৪ জেলার আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। এদের মধ্যে জামালপুরে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় সাতজন, খাগড়াছড়িতে মাদরাসাছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় একজন ও নোয়াখালীতে শিশুধর্ষণের ঘটনায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া গোপালগঞ্জে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের মামলায় দুই জনের যাবজ্জীবন ও শরীয়তপুরে ছাত্রী ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের সাজা বাতিল করে দু’জনকে খালাস এবং দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ : জেলার কাশিয়ানী উপজেলায় অষ্টম শ্রেণি পড়–য়া এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় প্রধান আসামি উজ্জ্বল বিশ্বাস এবং অপরাধে সহায়তার দায়ে কল্পনা বিশ্বাসকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রধান আসামিকে এক লাখ টাকা এবং সহায়তাকারীকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে ২০২০ সালে কাশিয়ানী উপজেলার তিলছড়া গ্রামের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে উত্যক্ত করতেন উজ্জ্বল বিশ্বাস। পরে একই বছরের ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় কল্পনা বিশ্বাস তালের পিঠা বানানোর কথা বলে ওই শিক্ষার্থীকে নিজের বাড়িতে ডেকে নেন। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় কল্পনা বিশ্বাস অপরাধে সহায়তা করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে আদালতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর কাশিয়ানী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৪ মার্চ পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২২ সালের ১৭ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মামলাটি নবগঠিত শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। রায় ঘোষণার পর অভিযুক্তদের গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এড. মোঃ তৌফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৬ বছর পর এ মামলাটির রায় হলো। বর্তমান সময়ে যেভাবে ধর্ষণ বেড়েছে, তাতে এ রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যারা এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ করে, এটি তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আমরা এতে সন্তুষ্ট।
অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ কদরে আলম খান বলেন, আমরা সমস্ত বাদী ও সাক্ষীদের জেরা করেছি। আশাবাদী ছিলাম যে আমার মক্কেলরা খালাস পাবেন এবং ন্যায়বিচার পাবেন। কিন্তু তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবো।
জামালপুর : জেলার বকশীগঞ্জে এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া দণ্ডপ্রাপ্ত সবাইকে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আব্দুর রহিম আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন পাপ্পু, বিজু, বাদশা, জুয়েল, আশরাফুল, জসিম ও আসমত। আর খালাস পাওয়া আসামি হলেন ইদ্রিস আলী। তারা সবাই জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফজলুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ২৫ মে রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগী গৃহবধূ শেরপুর জেলার ঝগড়ারচর বাজার থেকে ইদ্রিস আলীর ইজিবাইকে বকশীগঞ্জের জানকিপুরের ভাড়া বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। পথে গাড়িটি থামিয়ে গৃহবধূকে একটি ভ্যান গাড়িতে তুলে নেন আসামিরা। পরে বকশীগঞ্জের নিলক্ষিয়া উত্তরপাড়ায় ফরিদ নামে এক ব্যক্তির পরিত্যক্ত রান্নাঘরে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে তারা পালিয়ে যান। ঘটনার পরদিন ভুক্তভোগী গৃহবধূ বাদী হয়ে ছয়জনের নামে ও তিন থেকে চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করে বকশীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। আট মাস পর মামলার তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল চার্জশিট দেয় তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ৯ জন স্বাক্ষীর মধ্যে সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সোমবার এই রায় ঘোষণা করেন আদালত।
মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী এড. মোঃ মোকাম্মেল হক ও বাদীপক্ষের আইনজীবী এড. মোঃ ফজলুল হক।
খাগড়াছড়ি : জেলাতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ মামলায় এক আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। সোমবার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শায়েলা শারমিন এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এটিই প্রথম মামলার রায়। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনার মাত্র ১১ মাস ১৪ দিনের মাথায় এ মামলার রায় দেওয়া হলো। মামলা চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে ৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের ভিত্তিতে আদালত এ সিদ্ধান্ত নেয়। মামলার রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সুজনী ত্রিপুরা।
নোয়াখালী : জেলার চাটখিল উপজেলার মেঘা গ্রামের আলোচিত শিশু আসমা আক্তার (৫) ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি শাহাদাতের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে মামলার অন্য দু’টি ধারা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে নোয়াখালীর বিশেষ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা আকতার এই রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে, মামলার রায়ের তারিখ তৃতীয় দফা পরিবর্তন করে ৬ জুলাই নির্ধারণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ চার বছরের আইনি লড়াই শেষে এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পেল নিহত আসমার পরিবার।
রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মামলার বাদী ও নিহতের বাবা মাওলানা মো. শাহজাহান এবং বাদীপক্ষের আইনজীবী এড. শুক্লা সাহা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। বর্তমানে ঢাকার তেজগাঁও জামে মসজিদে ইমাম হিসেবে কর্মরত মাওলানা মোঃ শাহজাহান কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার নিষ্পাপ মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার পেয়েছি। এখন আসামি শাহাদাতের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি যেন দ্রুত কার্যকর হয়, সরকারের কাছে সেই দাবি জানাই।’
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৪ মার্চ চাটখিল উপজেলার মেঘা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় শিশু আসমা আক্তার। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর বাড়ির পেছনের একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার নয় দিন পর একই বাড়ির বাবলু মিয়ার ছেলে শাহাদাতকে (২২) গ্রেফতার করা হয়। পরে পুলিশ হেফাজতে দেওয়া স্বীকারোক্তিম‚লক জবানবন্দিতে শাহাদাত জানায়, ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে সে আসমাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিয়েছিল। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তখন মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) সেলিম শাহী রায়ের পর বলেন, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামির জবানবন্দির ভিত্তিতে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে, আদালত আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির যে রায় দিয়েছেন, তা দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের পর চাটখিলজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও খুনি শাহাদাতের ফাঁসির দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।
শরীয়তপুর : জেলার জাজিরার আলোচিত পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রিমা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাজা বাতিল করে দুজনকে খালাস এবং দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। সোমবার সকালে বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
খালাস পাওয়া দু’জন হলেন স্বপ্না বেগম ও সেলিম চৌকিদার। চুন্নু মোড়ল ও নুরু মোড়লকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৭ মে শিশু রিমাকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে চারজনকে ফাঁসির আদেশ দেয় শরিয়তপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ