খুলনা | বুধবার | ০৮ জুলাই ২০২৬ | ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পাবলিক পরীক্ষায়

ডিজিটাল কারসাজির সাজা ৫ বছরের কারাদণ্ড সংসদে কণ্ঠভোটে বিল পাস

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪৯ এ.এম | ০৮ জুলাই ২০২৬


প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল কারসাজিতেও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে বিলে। একই সঙ্গে বিলে উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়নের সাজার বিধানও রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (এ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিলটি পাসের জন্য সংসদে তোলেন। বিলের ওপর আনা জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি শেষে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
এই আইনে ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রশ্নপত্র ফাঁসের’ শাস্তি যুক্ত করা হয়েছে। যেকোনো ভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাজা হবে পাঁচ বছর। বিদ্যমান আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর।
বিলে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ বা ডিজিটাল কারসাজির সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, পাবলিক পরীক্ষার ডেটাবেইসে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং, পরিবর্তন, সংশোধন, মুছে ফেলা বা লুকানো ডিজিটাল কারসাজির আওতায় পড়বে।
ডিজিটাল কারসাজি করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে। বিলে বলা হয়েছে, পরীক্ষাকেন্দ্রে নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ বা প্রবেশের  চেষ্টা এবং পরীক্ষা পরিচালনা-সংক্রান্ত বৈধ নির্দেশনা অমান্যে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
নতুন আইনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ যেকোনো মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। সংশোধিত আইনে আরও কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রেও শাস্তির মেয়াদ কমানো হয়েছে।
সংশোধিত আইনটি ১৯৮০ সালের ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন্স (অফেন্সেস) এ্যাক্ট’-কে যুগোপযোগী করেছে। প্রায় ৪৫ বছর আগে প্রণীত ওই আইনে নকল, প্রশ্নফাঁস, জাল সনদ ও অন্যান্য অনিয়ম প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবেলায় নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বিলে প্রথমবারের মতো ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ বা ডিজিটাল কারসাজির সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় পাবলিক পরীক্ষার ডেটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং, তথ্য পরিবর্তন, সংশোধন, মুছে ফেলা বা গোপন করার মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্রে নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন বা বহনের চেষ্টা এবং পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত বৈধ নির্দেশনা অমান্য করলেও একই মাত্রার শাস্তি দেওয়া যাবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো পরীক্ষার্থীকে অসদুপায়ে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে বা তার পক্ষে অন্য কারও সঙ্গে লিখিত বা মৌখিক চুক্তি করলে, কিংবা এমন চুক্তির চেষ্টা করলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
সংশোধিত বিলে উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়নের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কোনো পরীক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তরপত্র অতিমূল্যায়ন (ওভার অ্যাসেস) বা অবমূল্যায়ন (আন্ডার অ্যাসেস) করলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে তৃতীয় পরীক্ষকের মূল্যায়নের মাধ্যমে অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তরপত্রে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়া পরীক্ষকদের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। তবে শাস্তি দেওয়ার আগে তৃতীয় একজন পরীক্ষকের মাধ্যমে নম্বরের অসংগতি নিশ্চিত করতে হবে।
পরীক্ষা-সংক্রান্ত কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সেবাদাতা সংস্থার দায়ও নির্ধারণ করা হয়েছে সংশোধিত আইনে। কোনো প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধে সহায়তা করলে বা যোগসাজশে জড়িত হলে অর্থদণ্ড, লাইসেন্স স্থগিত, কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি কিংবা কালো তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নতুন আইনে তথ্যদাতা বা হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে। অপরাধের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এ সুরক্ষা লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো শিশু এ আইনের অধীনে অপরাধে জড়িত হলে তার বিচার শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এসব অপরাধকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মহানগর এলাকায় মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহানগরের বাইরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এসব মামলার বিচার করবেন। বিচার কার্যক্রম ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের প্রবণতাও বেড়েছে। তাই পাবলিক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছিল। সাইবার অপরাধের মাধ্যমে পরীক্ষার ডাটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ ও ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, ডিজিটাল জালিয়াতিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান এবং সংঘবদ্ধ পরীক্ষা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ সংশোধিত আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ