খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৯ জুলাই ২০২৬ | ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

জবাবদিহিতার সংকট ও আমাদের দায়বদ্ধতা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:১৮ এ.এম | ০৯ জুলাই ২০২৬


সভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতার প্রকৃত মহত্ত¡ তার প্রয়োগে নয়, বরং তার জবাবদিহিতায় নিহিত। রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র, সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক রাষ্ট্রÑমানবজাতির দীর্ঘ অভিযাত্রা মূলত ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের এবং ক্ষমতাধারীকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করার সংগ্রামের ইতিহাস। আজকের পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্রের উন্নতির মানদন্ড শুধু তার উঁচু অট্টালিকা, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছ, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং তার নাগরিকরা কতটা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেÑতার ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে যখন উচ্চারিত হয়Ñ“যে হিসাব চাইবে, তাকেই হিসাবের বাইরে বের করে দেওয়া হবে”Ñতখন এটি কেবল একটি বক্তব্য থাকে না; বরং একটি মানসিকতার প্রতিফলন হয়ে ওঠে। এমন এক মানসিকতা, যা প্রশ্নকে ভয় পায়, সমালোচনাকে অপছন্দ করে এবং জবাবদিহিতাকে দায়িত্বের পরিবর্তে বোঝা মনে করে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এই ধরনের চিন্তাধারা আমাকে উদ্বিগ্ন করে। কারণ রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসেবে আমরা ক্ষমতার মালিক নই; আমরা জনগণের অর্পিত দায়িত্বের রক্ষক মাত্র।
প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন করার অধিকারই গণতন্ত্রের প্রাণ। যেখানে প্রশ্ন নেই, সেখানে জবাবদিহিতা নেই; আর যেখানে জবাবদিহিতা নেই, সেখানে সুশাসন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং সত্য অনুসন্ধান করতে উৎসাহিত করেছেন। মানবসভ্যতার অগ্রগতিও ঘটেছে প্রশ্ন করার সাহস থেকে। বিজ্ঞান, দর্শন, রাষ্ট্রনীতিÑসবকিছুর ভিত্তিতে রয়েছে অনুসন্ধিৎসা। অথচ আমরা যদি প্রশ্নকেই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে উন্নতির পথ নিজেরাই সংকুচিত করে ফেলি।
ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়Ñযে ক্ষমতা হিসাব দিতে চায় না, একসময় সেই ক্ষমতাই জনগণের আস্থা হারায়। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো এই সত্য অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। সুইডেন ১৭৬৬ সালে বিশ্বের প্রথম তথ্য উন্মুক্তকরণ আইন প্রণয়ন করে। আজও দেশটি বিশ্বের অন্যতম স্বচ্ছ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক কিংবা নিউজিল্যান্ডে সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ অত্যন্ত বিস্তৃত। যুক্তরাজ্যে সংসদীয় জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকেরা তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে তথ্য চাইতে পারেন এবং সরকারকে তার জবাব দিতে হয়।
এই দেশগুলো উন্নত হয়েছে কেবল অর্থনৈতিক শক্তির কারণে নয়; বরং তারা এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যেখানে প্রশ্নকে শত্র“তা নয়, বরং উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে দেখা হয়। তারা বুঝেছেÑস্বচ্ছতা সরকারকে দুর্বল করে না, বরং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে।
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় প্রশ্নকে বিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কেউ কোনো প্রকল্পের ব্যয় জানতে চাইলে, কোনো সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে কিংবা কোনো অনিয়মের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলে তাকে প্রায়ই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। অথচ একজন সচেতন নাগরিকের প্রশ্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়; বরং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর, আরও জবাবদিহিমূলক এবং আরও জনমুখী করার প্রচেষ্টা।
প্রশাসনের ভেতরেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি মনে করেন যে সত্য কথা বললে বা যৌক্তিক প্রশ্ন তুললে তার পদোন্নতি ব্যাহত হবে, তাকে একঘরে করা হবে কিংবা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে, তাহলে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ভয়ের সংস্কৃতি জন্ম নেয়। সেই ভয় নীরবতা সৃষ্টি করে, আর নীরবতা সৃষ্টি করে অদৃশ্য অবক্ষয়। তখন ভুলগুলো সংশোধিত হওয়ার পরিবর্তে জমতে থাকে, অনিয়মগুলো প্রতিরোধের পরিবর্তে শক্তিশালী হতে থাকে।
দুর্নীতি সাধারণত টাকার লেনদেন দিয়ে শুরু হয় না; এটি শুরু হয় জবাবদিহিতার অভাব দিয়ে। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মনে করতে শুরু করে যে তাকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না, তখনই অনিয়মের বীজ অঙ্কুরিত হয়। তাই দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রামের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র কেবল আইন নয়; বরং একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ডিজিটাল সেবার স¤প্রসারণ আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আমরা কতটা স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি তার ওপর। কারণ অবকাঠামো নির্মাণ করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু আস্থা নির্মাণ করা অনেক কঠিন। আর সেই আস্থার ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগ আমাদের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি, অর্জন এবং সীমাবদ্ধতা যদি নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা যায়, তাহলে সন্দেহের জায়গা কমে যাবে। তথ্য গোপন করার প্রবণতা অবিশ্বাস সৃষ্টি করে; তথ্য উন্মুক্ত করার সংস্কৃতি আস্থা সৃষ্টি করে। জনগণ তখন রাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুভব করে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, প্রশ্নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং প্রশ্নই আমাদের আরও সতর্ক, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও দক্ষ হতে সাহায্য করে। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে সৎ, তার কাছে হিসাব দেওয়া কোনো অপমান নয়; বরং এটি গৌরবের বিষয়। কারণ জবাবদিহিতা দুর্বলতার নয়, আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।
পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সততা ও স্বচ্ছতার উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী। ইতিহাস কখনো ক্ষমতার অহংকারকে মনে রাখে না, কিন্তু ন্যায়পরায়ণতা ও দায়বদ্ধতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাই আমাদের অঙ্গীকার হোকÑপ্রশ্নকে ভয় নয়, স্বাগত জানাব; হিসাব চাইলে বিরক্ত হব না, বরং জবাব দিতে প্রস্তুত থাকব; সমালোচনাকে দমন করব না, বরং তা থেকে শিক্ষা নেব। কারণ জবাবদিহিতার পথই সুশাসনের পথ, আর সুশাসনের পথই একটি উন্নত, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।
যে রাষ্ট্রে হিসাব চাওয়ার অধিকার সম্মানিত হয়, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের দিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। আর যে প্রশাসন প্রশ্নকে ভয় পায় না, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই রায় দেয়।
লেখক: বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ২১ দিন আগে

ইসলাম

প্রায় ২৭ দিন আগে