খুলনা | শুক্রবার | ১০ জুলাই ২০২৬ | ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

১১ বছরের মুসলিম শিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণের পর চোখ উপড়ে বিভৎসভাবে হত্যা, জড়িত ৪ হিন্দু যুবক

পশ্চিমবঙ্গে অবশেষে প্রধান অভিযুক্ত ধর্ষক এনকাউন্টারে!

খবর প্রতিবেদন |
০১:৫৬ এ.এম | ০৯ জুলাই ২০২৬


ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে ১১ বছরের এক মুসলিম শিশুকে অপহরণ, ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। মুসলিম শিশুকে অপহরণ করে ধর্ষণের পর চোখ উপড়ে বিভৎসভাবে হত্যা করে ৪ হিন্দু যুবক। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) গভীর রাতে বারুইপুর থানা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে প্রভাসকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময়  সে হঠাৎ পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায়। আত্মরক্ষায় পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে প্রভাস গুরুতর আহত হয় এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে শিশুটি গত ৪ জুলাই বিকেলে বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার কিনতে গিয়ে নিখুঁজের পর তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে এ ব্যপারে এফআইআর করতে গেলে তাদের থানা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে এলাকার লোকজন স্থানীয়দের সিসি টিটিভি ফুটেজে দেখতে পান প্রভাস মন্ডলসহ ৪ হিন্দু যুবক মেয়েটিকে জোর করে একটি গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পরে ওই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় অপহরণ ও হত্যা মামলা দিতে গেলেও পুলিশ নেয়নি বলে ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ। পুলিশ লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রভাস মণ্ডলকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করে। তার দেওয়া তথ্য অনুসারে আনন্দ সরদার ও দিবাকর সরদার নামে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে তারা পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। অভিযুক্তদের ধরে এলাকাবাসী থানায় সোপর্দ করে আসলেও বিজেপি নেতারা ধর্ষকদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।
এ ঘটনা পর অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে কলকাতা। মুসলিম শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডটি পশ্চিমবঙ্গে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আর এ আন্দোলন দমতে তড়িঘড়ি করে মঙ্গলবার রাতে মূল আসামিকে এনকাউন্টারে হত্যা করে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন। 
এই ইস্যুতে কলকাতায় আন্দোলন তুঙ্গে, তৃণমূল নেত্রী মমতাসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, তখনই গদি বাঁচাতে রাতারাতি ধর্ষককে ধরে এনে এনকাউন্টারের নাটক সাজালো শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন। 
বারুইপুর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, এক ব্যক্তি আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন, মৃতদেহটি কোথায় রয়েছে। 
তার দেখানো জায়গা থেকে বস্তাবন্দি নাবালিকার মরদেহ উদ্ধার হতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। মারধর শুরু হয় ওই ব্যক্তিকে। ঘটনাচক্রে দেখা গিয়েছে, ওই ব্যক্তিই এই ধর্ষণ এবং খুন কান্ডের অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মন্ডল।
মঙ্গলবার রাতেই পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় প্রভাসের। মঙ্গলবার রাতে তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ জানায়, সেই সময় পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান প্রভাস। 
পুলিশের পাল্টা গুলিতে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। বারুইপুর কান্ডে প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রভাসই।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, অর্থের লোভ দেখিয়ে আনন্দ সরদার প্রভাসকে দিয়ে শিশুটিকে অপহরণ করিয়েছিলেন বলে প্রভাস দাবি করেছিল। তবে আনন্দ সরদার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। পুলিশের মতে, এই নৃশংস ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিল প্রভাস মণ্ডল।
গণ শনিবার বন্ধুর জন্মদিনে যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ওই নাবালিকা। তার পর থেকে তার আর খোঁজ মেলেনি। তার খোঁজ করার সময় এলাকার কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ। সেই সময় ওই নাবালিকাকে এক যুবকের সঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়। 
নীল টি-শার্ট এবং লাল টুপি পরা ওই যুবকের খোঁজ শুরু হয়। সেই সূত্র ধরে পুলিশ ওই যুবককে শনাক্ত করে। তার পরই গ্রেফতার হন প্রভাস। তাকে জেরা করে আরও তিন অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয় আরও এক যুবককে।
প্রভাসের বাড়ি সূর্যপুর এলাকাতেই। স্থানীয় সূত্রে খবর, পরিবারে মা, বাবা, স্ত্রী এবং এক পুত্রসন্তান রয়েছে। প্রভাসের বাবা অসুস্থ। মা গৃহবধ‚। স্ত্রী পরিচারিকার কাজ করেন। 
তবে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় প্রভাসের নাম জড়ানোর পর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান প্রভাসের স্ত্রী। বাড়িতে প্রভাসের মা এবং বাবা রয়েছেন। 
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রভাস মণ্ডল স্থায়ী কোনো পেশায় যুক্ত ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন সময় ভ্যান চালানোসহ নানা ধরনের কাজ করতেন। তদন্তে জানা গেছে, তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং গ্রেফতারের পর প্রথমদিকে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে অন্যান্য অভিযুক্তদের সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রভাসের মা সন্ধ্যা মন্ডল বলেন, আমাদের কথা শুনত না। নেশা করত। জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় বাকি অভিযুক্তরাও প্রভাসের নেশার সঙ্গী ছিলেন। 
সূত্রের খবর, গ্রেফতার হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। 
তবে তার স‚ত্র ধরে বাকি অভিযুক্তদের গ্রেফতারের পর প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ভাবে জেরা করে পুলিশ। তখনই ঘটনার পুরো ছবি স্পষ্ট হয়।
বারুইপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুত চার্জশিট দাখিল এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগণ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। 
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া

প্রিন্ট

আরও সংবাদ