খুলনা | শনিবার | ১১ জুলাই ২০২৬ | ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

বিপর্যস্ত মোংলা উপকূলবাসী

টানা ৭ দিনের ভারী বর্ষণে বন্দরে খাদ্যবাহী জাহাজের কাজ বন্ধ, চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ার শঙ্কায় চাষিরা

মোংলা প্রতিনিধি |
০৭:০৩ পি.এম | ১০ জুলাই ২০২৬


বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর যৌথ প্রভাবে মোংলা সমুদ্র বন্দর ও সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে টানা সাত দিন ধরে অবিরাম ও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ চলছে। দিনভর বৃষ্টির কারণে এই অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অনেকেই। টানা এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় উপকূলীয় জনপদ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজার মানুষ। সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন এ অঞ্চলের সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষিরা। ঘের তলিয়ে কোটি কোটি টাকার মাছ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। এদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মোংলা বন্দরে অবস্থানরত খাদ্যবাহী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের খাদ্য পণ্য খালাস-বোঝাই কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

আবহাওয়া অফিস ও উপজেলা প্রশাসন জানায়, মোংলা অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো মৎস্য ও চিংড়ি চাষ। টানা সাত দিনের অবিরাম বর্ষণে পশুর ও মোংলা নদীর জোয়ারের পানি কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় মোংলার বুড়িরডাঙ্গা, চিলা, চাঁদপাই, সুন্দরবন, সোনাইলতলা ও মিঠাখালী ইউনিয়নের শত শত চিংড়ি ঘের হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক ঘেরের পাড় ছুঁই ছুঁই করছে পানি। টানা সাত দিনের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি এবং সেই সাথে পশুর ও মোংলা নদীর জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৩ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। চাষিরা দিন-রাত জেগে নেট, পাটা ও বাঁশের বানা দিয়ে ঘেরের মাছ আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। স্থানীয় চিংড়ি চাষিরা জানান, আর কয়েক ঘণ্টা এভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ঘেরের পাড় ভেঙে বা উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে কোটি কোটি টাকার গলদা ও বাগদা চিংড়ি ভেসে যাবে। ব্যাংক ঋণ ও চড়া সুদে দাদন নিয়ে করা এই ঘেরগুলো ভেসে গেলে চাষিদের পথে বসতে হবে। এতে চাষিরা বড় ধরনের পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার বিভাগ জানিয়েছে, বন্দরে খাদ্যবাহী জাহাজের কাজ বন্ধ, টানা বৃষ্টির কারণে মোংলা বন্দরে জাহাজের পণ্য খালাস ও বোঝাই কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যান্ত্রিক উপায়ে তরল ও কন্টেইনার খালাস সীমিত আকারে চললেও, বন্দরে অবস্থানরত চাল ও সারবাহী খোলা (বাল্ক) বাণিজ্যিক জাহাজের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে এই খাদ্যসামগ্রী ভিজে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় হাচ (জাহাজের মালামাল রাখার ঢাকনা) বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল দীর্ঘ হচ্ছে এবং থমকে গেছে পণ্য পরিবহনের গতি।

পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) দীর্ঘ হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গত ২৬ জুন ৫ হাজার ৭শ মেট্রিক টন চাল নিয়ে মোংলা বন্দরে নঙ্গর করে। এ চাল সম্পুর্ন খালাস করতে যেখানে ৪দিন সময় লাগার কথা, বৃষ্টির কারণে তা ১৪ দিনে মাত্র ৯শ ২০ মেট্রিক টন খালাস হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য জাহাজের পন্যও খালাস করা যাচ্ছে না। খোলা অবস্থায় এসব খাদ্যসামগ্রী বৃষ্টিতে ভিজলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় জাহাজের হাচ (ঢাকনা) বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে পণ্য পরিবহনের গতি সম্পূর্ণ ধীর হয়ে পড়েছে। সারবাহী জাহাজও রয়েছে মোংলা বন্দরে।

পানিবন্দি জনজীবন ও খেটে খাওয়া মানুষের আর্তনাদ টানা বৃষ্টিতে মোংলা পৌর শহরের অনেক সড়ক ও নিচু এলাকার বাড়িঘরে পানি উঠে গেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পশুর নদীর পানির উচ্চতা বাড়ায় অনেক স্থানে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে শত শত মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও খেয়াঘাটের মাঝিরা। কাজ না থাকায় এবং রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকায় পরিবার নিয়ে চরম খাদ্য সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলো।

টানা বৃষ্টি ও লাগাতার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ছাতা বা রেইনকোট মাথায় দিয়েও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির তোড় ও ঝোড়ো বাতাস থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। কাঁচা ও আধা-পাকা রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত এবং প্লাবিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারছে না, ফলে বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

মোংলা আবহাওয়া অফিস ইনচার্জ হারুন আর রশিদ জানায়, সমুদ্র বন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় আরও অন্তত দু-একদিন স্থায়ী বৈরী আবহাওয়া এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। 
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ