খুলনা | রবিবার | ১২ জুলাই ২০২৬ | ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

তাওবাহ’র প্রতিবন্ধকতা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
১২:০৩ এ.এম | ১১ জুলাই ২০২৬


তাওবাহ মহান আল্লাহ তা’য়ালার অসীম রহমত লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। গুনাহ মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতার প্রকাশ, কিন্তু গুনাহের ওপর অবিচল থাকা ঈমানের জন্য ভয়ঙ্কর। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে কখনো ভুল করে নাÑএটি নয়; বরং ভুল করার পর অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালার দিকে ফিরে আসে। কিন্তু শয়তান ও নফস এমন বহু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যা মানুষকে তাওবাহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
তাওবাহর সবচেয়ে বড় শত্র“ হলো শয়তান। সে মানুষের সামনে গুনাহকে আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে তোলে। ধীরে ধীরে গুনাহ অভ্যাসে পরিণত হয় এবং অভ্যাস একসময় স্বভাব হয়ে যায়। তখন ইবাদত-বন্দেগি কঠিন মনে হয়, আর মহান আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্যের পরিবর্তে প্রবৃত্তির অনুসরণই সহজ ও স্বাভাবিক বলে মনে হয়। যেমন দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা লোহার ওপর মরিচা জমে যায়, তেমনি বারবার গুনাহ মানুষের অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে সত্য উপলব্ধির শক্তিও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে যায়।
শয়তানের আরেকটি ভয়ংকর কৌশল হলো সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্যের রূপে উপস্থাপন করা। কখনো হারামকে হালাল, আবার কখনো হালালকে হারাম বলে বিভ্রান্ত করে। এমনকি ভালো কাজকে খারাপ এবং খারাপ কাজকে ভালো বলে মনে করিয়ে দেয়। তখন মানুষ নিজের ভুলকেই সঠিক মনে করতে শুরু করে। যে ব্যক্তি নিজের অসুস্থতাই উপলব্ধি করতে পারে না, সে যেমন চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করে না, তেমনি যে ব্যক্তি গুনাহকে গুনাহ মনে করে না, তার অন্তরে তাওবাহর আকাক্সক্ষাও জাগে না।
তাওবাহ বিলম্বিত করাও শয়তানের একটি পুরোনো ফাঁদ। সে মানুষকে বলে, “এখনই তাওবাহর কী প্রয়োজন? সামনে তো অনেক সময় আছে।” ছাত্রজীবনে বলে, পড়াশোনা শেষ হলে করো; চাকরি হলে বলে, সংসার গুছিয়ে নাও; সংসার হলে বলে, বার্ধক্যে তাওবাহ করলেই হবে। এভাবেই একদিন জীবন ফুরিয়ে যায়। অথচ মৃত্যু কখনো বয়স, পেশা কিংবা পরিকল্পনার অপেক্ষা করে না। তাই তাওবাহর সর্বোত্তম সময় আগামীকাল নয়, আজ; পরে নয়, এখনই।
গুনাহকে তুচ্ছ মনে করাও তাওবাহর পথে একটি মারাত্মক বাধা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “মুমিন তার গুনাহকে এমন মনে করে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং আশঙ্কা করছে পাহাড়টি তার ওপর ভেঙে পড়বে। আর পাপী ব্যক্তি নিজের গুনাহকে এমন মনে করে, যেন একটি মাছি তার নাকের ওপর বসে আবার উড়ে গেল।” (বুখারী)
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে বেঁচে থাকো। ছোট ছোট কাঠি যেমন একত্র হয়ে বড় আগুন জ্বালায়, তেমনি তুচ্ছ মনে করা গুনাহগুলো একসময় মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।” (মুসনাদ আহমাদ) বাস্তবেও দেখা যায়, বড় অপরাধের সূচনা হয় ছোট ছোট অবহেলা থেকে। তাই কোনো গুনাহকেই ছোট মনে করা উচিত নয়।
ইসলামের ইতিহাসে আত্মসমালোচনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। এত মহান মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্তে¡ও তিনি প্রায়ই নিজের নফসকে উদ্দেশ করে বলতেন, “হে উমার! আজ তুমি নিজের হিসাব নাও, কারণ আগামীকাল তোমাকেই হিসাব দিতে হবে।” এই আত্মসমালোচনাই মানুষকে তাওবাহর পথে অটল রাখে এবং গুনাহকে কখনো হালকা করে দেখতে দেয় না।
অনেক মানুষ তাওবাহ করতে চাইলেও সমাজ ও বন্ধুদের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে পিছিয়ে যায়। কেউ মনে করে, তাওবাহ করলে আগের সঙ্গীরা দূরে সরে যাবে, জীবনযাপনে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে কিংবা মানুষ তাকে বিদ্রুপ করবে। অথচ মানুষের সন্তুষ্টি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মহান আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টিই চিরস্থায়ী সফলতার চাবিকাঠি। যে মহান আল্লাহ তা’য়ালার জন্য কিছু ত্যাগ করে, তিনি তাকে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করেন।
হতাশাও তাওবাহর অন্যতম বড় শত্র“। শয়তান মানুষকে বোঝায়, “তুমি এত গুনাহ করেছ যে, তোমার আর ক্ষমা পাওয়ার কোনো আশা নেই।” অথচ এটি শয়তানের সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলোর একটি। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, “হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা মহান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় মহান আল্লাহ তা’য়ালা সব গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আজ-যুমার: ৫৩)
মুমিনের জীবন গুনাহমুক্ত নাও হতে পারে, কিন্তু তাওবাহশূন্য হওয়া উচিত নয়। কারণ, আন্তরিক অনুশোচনা মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা, গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা, তাওবাহ বিলম্বিত করা, মানুষের সমালোচনার ভয় কিংবা হতাশাÑকোনোটিই যেন আমাদের মহান আল্লাহ তা’য়ালার দিকে ফিরে আসার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। যে বান্দা আন্তরিক হৃদয়ে তাঁর দরবারে ফিরে আসে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা কখনো তাকে নিরাশ করেন না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে আন্তরিক, খাঁটি ও কবুলযোগ্য তাওবাহ করার তাওফীক দান করুন। আমীন। 
লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট