খুলনা | শনিবার | ১১ জুলাই ২০২৬ | ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৮২৩ কোটি টাকার পরিকল্পনাহীন মেগা প্রকল্প এখন জনগণের গলায় ফাঁস

৫১ ঘণ্টার ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নগরীতে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:০৬ এ.এম | ১১ জুলাই ২০২৬


টানা ভারী বৃষ্টিতে খুলনার বেশির ভাগ সড়ক ও নিম্নাঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত। মহানগরী কোথাও হাটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমে। সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালক সবাই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। 
টানা ৫১ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের ফলে নগরীর টুটপাড়া, রয়েল মোড়, মিস্ত্রিপাড়া, আহসান আহমেদ রোড, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চাঁনমারী, লবণচরা, রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়। এ সময়ে ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে খুলনা আবহাওয়া দপ্তর।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোঃ মিজানুর রহমান শুক্রবার জানান, গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মোট ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। 
এর আগে ১ জুলাই মাত্র ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল। এই বৃষ্টিতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ নিচু এলাকা তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েন বাসিন্দারা। বৃষ্টিপাতের ফলে নগরীর টুটপাড়া, রয়েল মোড়, মিস্ত্রিপাড়া, আহসান আহমেদ রোড, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চাঁনমারী, লবণচরা, রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়।
বৃষ্টিতে নগরীর অনেক এলাকায় হাটুসমান, কোথাও কোথাও তারও বেশি পানি জমেছে। সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। 
মোল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন জানান, “বৃষ্টি হলেই রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়। কাদাপানিতে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পানি অপসারণের ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় আটকে আছে। ফলে বৃষ্টি হলেই ড্রেনের নোংরা পানি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।”
নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কবীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর শেখ বলেন, “এবার যতবার বৃষ্টি হচ্ছে, ততবারই বাড়ির নিচতলায় পানি উঠছে। আগেও বৃষ্টি হলে দুর্ভোগে পড়তাম, কিন্তু একদিনে পানি সরে যেত। এখন বিপদ হয়েছে অন্য রকম, আমাদের এলাকায় পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।” “প্রায় এক বছর আগে কবীর বটতলা থেকে কারিগরপাড়া পর্যন্ত আমাদের এলাকার সড়ক ও পাশের ড্রেন প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু, বাড়িঘর থেকে ওই ড্রেনে বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো কার্যকর সংযোগ রাখা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির উঠান ও নিচতলা পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক বাড়ি যেন ছোট ছোট পুকুরে পরিণত হয়েছে। একবার পানি জমলে তা নামতে সাত থেকে আট দিন পর্যন্ত সময় লাগে”, যোগ করেন তিনি। 
নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তুহারা কাঁচা বাজারের মুদি দোকানী আব্দুর রব তার দোকানের সামনে হাটু সমান পানি দেখিয়ে বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই সিটি কর্পোরেশনের এই কাঁচাবাজার ডুবে যায়। বাজারের ব্যবসায়ীদের নানা রকমের দুর্ভোগে পড়তে হয়। অথচ বাজারের পাশেই একটা বড় ড্রেন আছে। দীর্ঘদিন ধরে এটার সংস্কার কাজ চলছে। এই বর্ষায়ও কাজ চলছে। এই কাজ কবে শেষ হবে তা তো জানি না! দুর্ভোগও যাবে না। কেসিসি কর্মকর্তারা যদি ঠিকাদারকে তাগিদ দিত, তাহলে এই কাজ আগেই শেষ হয়ে যেত।”
নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর চৌরাস্তা এলাকার ইজিবাইকচালক ছোটন গাজী বলেন, “বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যোগ হয়েছে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি। আজ (শুক্রবার) সকালে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে বিপদে পড়েছি। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। বয়রা বাজারের কাছে একটি গ্যারেজে রেখে চলে এসেছি।”
খুলনা সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে খুলনায় প্রায় ৮২৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে করা অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পাম্প স্টেশন নির্মাণে ধীরগতিসহ নকশায় ত্র“টির বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। বৃষ্টি হলেই এখন ড্রেনের নোংরা পানিতে বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সয়লাব হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পানি জমে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি তৈরি হয়।
নাগরিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, প্রায় ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার কাজ করলেও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির সুফল মিলছে না। উল্টো বিভিন্ন স্থানে ধীরগতির উন্নয়ন কাজ, খোঁড়াখুঁড়ি ও অপরিকল্পিত রাস্তা উঁচু করায় শহরের কয়েক হাজার বাড়িঘর রাস্তার তুলনায় নিচু হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই ড্রেনের নোংরা পানি ওইসব বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে। সেই সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।
নারী নেত্রী এড. শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, “খাল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নদী-খাল ভরাট, জলাধার দখল ও জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানি শহরে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।”
তিনি বলেন, “আমার নিজের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। গত রাতের বৃষ্টিতে স্কুলের পাঁচটি শ্রেণি কক্ষ হাটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ রকম অবস্থা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে।” 
নাগরিক সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এড. বাবুল হাওলাদার বলেন, “বৃষ্টি হলেই খুলনা নগরী ডুবে যায়। উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সারা বছর ধরেই সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। নগরজুড়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক কাজ হলেও জলাবদ্ধতার পুরানো ভোগান্তি রয়েই গেছে।’
কেসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, রূপসা ও ভৈরব নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় শহরের পানি নামতে পারে না। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীন উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় সেখানে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়।
এদিকে নতুন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অধিকাংশ ড্রেনের ওপর কংক্রিটের ঢাকনা বা স্ল্যাব বসানো হয়েছে। ফলে মানুষের চলাচল সহজ হলেও ড্রেন পরিষ্কার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেসিসি সূত্র অনুসারে, নগরীতে মোট ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ‘খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছরে খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ হয়েছে।
এ প্রকল্পের পরিচালক কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, “এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্যাসার্ধের ১৪৭ কিলোমিটার ১৬৯টি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এর সবগুলোই ঢাকনাযুক্ত ড্রেন।”
কেসিসির প্রধান কনজারভেন্সি অফিসার মোঃ আনিসুর রহমান বলেন, “আমরা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছি। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে আমরা আপাতত এই কাজ বন্ধ রেখেছি। কারণ ড্রেন থেকে তোলা নরম কাদা মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আবার ড্রেনে চলে যাচ্ছে।”
জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের বিষয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক খাল, জলাশয় সংরক্ষণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার গভীরে কেউ যায়নি। গত সাড়ে তিন মাসে আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। এখন সমন্বিতভাবে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।” 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ