খুলনা | রবিবার | ১২ জুলাই ২০২৬ | ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

ঢামেক ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

মাকে বিদেশে নিইনি, কারণ এ রকম মানবিক সেবা সেখানে পাওয়া যেত না

খবর প্রতিবেদন |
০১:২২ এ.এম | ১২ জুলাই ২০২৬


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের চিকিৎসকেরা আমার মাকে যে সেবা দিয়েছেন, সে ধরনের হিউম্যান টেককেয়ার বিদেশে পাওয়া যেত না।’ শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ দেশেরই প্রখ্যাত কয়েকজন চিকিৎসক আমার মাকে অনেকগুলো বছর ধরে চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রত্যেক মুহ‚র্তে তারা তাকে টেককেয়ার করেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন। ডিবেট হচ্ছিল আমাদের মধ্যে আবার নেব কি নেব না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলাম, আপনারা যে ওনাকে নিতে চাচ্ছেন, কিন্তু এখানে চিকিৎসকরা ওনাকে যে সেবাটা দিচ্ছেন, চব্বিশটা ঘণ্টা, প্রতিটি মুহ‚র্ত এই যে হিউম্যান টেককেয়ার, আমি মনে করি না, এটা বিদেশে গেলে পাওয়া যাবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিদেশে গেলে হয়তো টেকনিক্যাল সাপোর্ট ভালো পাওয়া যেত, ইকুইপমেন্ট ভালো হতো। কিন্তু যে সেবাটা ওনার জীবনের শেষ মুহ‚র্ত পর্যন্ত তিনি পেয়েছেন, আমি দেখেছি, ওনারা কত আন্তরিকতার সঙ্গে সেবাটা দিয়েছেন। পৃথিবীর যত ভালো হাসপাতালই হোক, এটা পাওয়া যেত না। সে জন্য ব্যক্তিগণভাবে আমি সেই মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু একটি কলেজ নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত একটি সাক্ষী। ঢাকা মেডিকেল ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সফল করতে অবদান রেখেছে। সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রত্যেক চিকিৎসক, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শহীদ ও আহত মানুষগুলোর পাশে তারা দাঁড়িয়েছিলেন। এই মেডিকেল কলেজ শুধু বড় বড় চিকিৎসক তৈরি করেনি; শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করেছে।’
তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল এখন রাজধানীর মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। যারা চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন, প্রত্যেক মানুষের মনোজগতে আপনারা এমন একজন মানুষ, যাদের কাছে আমরা ভরসা করি। যাকে পরম বন্ধু ভাবি। একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে আরেক জনের কাছে যায়, তখন তার ওপর পরম ভরসা করে বলেই যায়।’
প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর এর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন রোগীকে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রের যে খরচ হয়, রাষ্ট্র যদি প্রিভেনশনের ব্যবস্থা নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের খরচ অনেক কম হয়। আমরা এদিকে মনোযোগ দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘হেলথ কেয়ারারকে আমরা বিশেষ প্রশিক্ষণ দেব, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করবেন। যাতে রোগবালাই কম হয়, সেদিকে তারা জোর দেবেন।’
ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসায় বিদেশ মুখিতা বন্ধ হবে:  আজকের শিক্ষার্থী-ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশ মুখিতা বন্ধ হবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকার স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা প্রতিদিনই মানুষের অনেক আনন্দ-বেদনার সাক্ষী। যারা চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত কিংবা চিকিৎসক হওয়ার জন্য অধ্যয়নরত, প্রতিটি মানুষের মনোজগতে আপনাদের অবস্থান তাদের সুস্থ জীবনের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এ উপলব্ধি থেকেই সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, চিকিৎসকগণই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। চিকিৎসকগণই রোগে-শোকে কাতর মানুষটির পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহারও একজন রোগীর কাছে ওষুধের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগণ উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।”
হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘Prevention is better than cure’ এই নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর বিকাশ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগাম স্বাস্থ্যপরামর্শ পেলে অনেক রোগ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সম্ভব।
তিনি বলেন, জনগণের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরামর্শ পৌঁছে দিতে সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হেলথ কেয়ারার পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শিক্ষাখাতের পর এবারই দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বছর জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এটি জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দেশের উপজেলাগুলোর জনসংখ্যা বিবেচনায় চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ৫০০টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ৫টিতে ১০০ বেডের হাসপাতাল রয়েছে, যা অপ্রতুল। এই কারণে রোগীদের শহরমুখী হতে হয়। জনগণের এই ভোগান্তি কমাতে দেশের সবকটি উপজেলায় বিদ্যমান ৩১ থেকে ৫১ বেডের হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০০ বেডে উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, দেশের সব উপজেলায় বিদ্যমান ৩১ থেকে ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলো পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি সব হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে।
মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানসম্মত অপসারণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসুন, আমরা সবাই মিলে মেডিক্যাল বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে অপসারণ এবং হাসপাতালগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যাতে শুরুতেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকার সারা দেশে ১ লাখ হেলথ কেয়ারার (স্বাস্থ্যকর্মী) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশই হবেন নারী, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরাসরি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
তিনি জানান, রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আরও ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও মিডওয়াইফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। 
হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা জোরদার করছে। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 
ঐতিহাসিক ঢাকা মেডিকেল কলেজের গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এই ক্যাম্পাসের অবদান এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি হওয়া মহৎ মানুষ ও চিকিৎসকদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর শ্রদ্ধা জানান।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ