খুলনা | রবিবার | ১২ জুলাই ২০২৬ | ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ

পারিবারিক কলহের জেরেই হত্যা, কিশোরীর বস্তাবন্দি লাশ মোটরসাইকেলে করে ফেলে আসেন বাবা : পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৩ এ.এম | ১২ জুলাই ২০২৬


নগরীর নিরালা প্রান্তিকা এলাকা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) বাবার লাঠির আঘাতে মাথায় গুরুতর জখম হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে বলে জানিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। পুলিশের দাবি, পারিবারিক কলহের জেরেই এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। শনিবার সকালে কেএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।
পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা শুক্রবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকান্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।
যেভাবে ঘটে হত্যাকান্ড : পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেলে নির্জনার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বাকবিুন্ডা হয়। একপর্যায়ে মা তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন। ঘরের ভেতরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাবা মোঃ আলিম হোসেন আকাশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি একটি কাঠের লাঠি দিয়ে নির্জনার মাথায় আঘাত করেন। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে বাবা-মা মিলে মরদেহ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে মোটরসাইকেলে করে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে রেখে আসেন বলে পুলিশের দাবি।
গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের সামনে বস্তাবন্দি অবস্থায় মরদেহটি দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
তদন্তের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। তিনি সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং খুলনা ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, তদন্তের একপর্যায়ে নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে হত্যাকান্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তী সময়ে আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরে তর্কের একপর্যায়ে বাবা মোঃ আলিম হোসেন আকাশ মেয়ের মাথায় লাঠি দিয়ে তিন-চারটি আঘাত করেন। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটির মৃত্যু হয়। এরপর মরদেহটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খুলনা সদর থানার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে রেখে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়।
পারিবারিক বিরোধের দাবি পুলিশের : সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, নির্জনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই পারিবারিক বিরোধ থেকেই হত্যাকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান।
মা গ্রেফতার, বাবা পলাতক : পুলিশ জানায়, ঘটনার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রধান অভিযুক্ত বাবা মোঃ আলিম হোসেন আকাশ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোঃ রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল এ ঘটনায় তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় খুলনা থানায় আটক নিহত নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, গত ২১ এপ্রিল বাড়ি থেকে পালিয়ে তেরখাদা উপজেলার পালেরহাট আজগরা গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রনিকে বিয়ে করে নির্জনা। এর তিনদিন পর আমাকে ফোন দিয়ে বলে আমি ভাল আছি। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারলাম ছেলের চরিত্র ভাল না। তাকে ১৭ দিন পর বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। ওই ছেলে প্রায় মেয়ের সাথে যোগাযোগ রাখত।
তিনি আরও বলেছিলেন, এ আগে ৮ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত অবস্থায় নির্জনা পালিয়ে ফকিরহাট উপজেলার বারইপাড়া এলাকার ইকলাসুরের ছেলে মনিরুজ্জামান মনিকে বিয়ে করে। সেখানে একদিন থাকার পর বাড়িতে ফিরে আসে।
ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ : পুলিশের দাবি, পলাতক বাবা আলিম হোসেন আকাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। তিনি একটি চিঠি প্রকাশ করে দাবি করেন, নির্জনা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তবে ওই চিঠির সত্যতা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এছাড়া যেদিন রাতে নির্জনার মরদেহ উদ্ধার হয়, সেদিনই তার ফেসবুক আইডি থেকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, যেখানে লেখা ছিল, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো পরিকল্পনা আছে, সকল কষ্ট এবং দুঃখে আলহামদুলিল্লাহ।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলীম হোসেন আকাশের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি নিয়মিত টিকটকার হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন টিকটক ভিডিও তৈরি করে ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করতেন। তিনি নিজেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী হিসেবে দাবি করলেও তার পেশার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, প্রাথমিক তদন্তে তাদের ধারণা নির্জনার বাবা একজন মাদকাসক্ত। বর্তমানে পলাতক বাবাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা-মা অভিযুক্ত হওয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছে। অভিযুক্ত অপর আসামি মেয়েটির বাবাকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (পিপিএম-সেবা) মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, ডেপুটি কমিশনার এম এম শাকিলুজ্জামান, ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) মোঃ রেজাউর রহমান, অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, সহকারী কমিশনার (খুলনা জোন) মোঃ শফিকুল ইসলাম, খুলনা থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ শফিকুল ইসলাম এবং খুলনাস্থ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ