খুলনা | রবিবার | ১২ জুলাই ২০২৬ | ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

বন্যার ঝুঁকিতে দেশের আরও ১০ জেলা

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪০ এ.এম | ১২ জুলাই ২০২৬


টানা কয়েকদিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে দেশের ৭ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেই সঙ্গে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এই অবস্থায় নতুন করে বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ১০ জেলা। শনিবার সন্ধ্যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এমন আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুরমা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংস নদী অববাহিকার সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় এবং উত্তরাঞ্চলীয় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদী অববাহিকার নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
তবে চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী ইত্যাদি নদীর পানি সমতল আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধীরগতিতে হ্রাস পেতে পারে এবং নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোয় বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে। এছাড়া মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, ধলাই, খোয়াই ইত্যাদি নদীর পানি সমুল আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধীরগতিতে হ্রাস পেতে পারে এবং নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোয় বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা বন্যাকবলিত রয়েছে। এছাড়া ফেনী, খাগড়াছড়ি, সিলেট, নেত্রকোণা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কক্সবাজারে এখনো পানির নিচে ১৫০ গ্রাম : টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও পাহাড় ধসে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো পানির নিচে। কোথাও কোথাও পানি কমতে শুরু করলেও চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বড় অংশে জলাবদ্ধতা কাটেনি। ফলে প্রায় তিন লাখ মানুষ দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। গণ সাত দিনে পানিতে ডুবে ও পাহাড় ধসে জেলায় অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক গ্রাম এখনো প্লাবিত। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি ও স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসুবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) মারা যান। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তার আগের দিন বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে সোলতান আহমদের দুই বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে তিন বছর বয়সী পুষ্পর মৃত্যু হয়। ভোরে চকরিয়ার মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড় ধসে বসুঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর প্রাণহানি ঘটে। এ ছাড়া কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা। কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও এখনো পানির নিচে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নূরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে আরও সময় লাগবে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এক লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভেড়িবাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। তাদের মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন। তবে স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে পানিবন্দি মানুষের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।
তিনি আরো জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার রাত পর্যন্ত গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আবদুল হান্নান আরো জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপক‚লীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রয়েছে। 
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ