খুলনা | সোমবার | ১৩ জুলাই ২০২৬ | ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিন

|
১২:০৬ এ.এম | ১৩ জুলাই ২০২৬


ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখার বিকল্প নেই। তবে ট্র্যাজেডি’র বিষয় হলো শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বলতে এখনো আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন মনে করি। এর বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ কম। ফলে শিক্ষক-ঘাটতির কারণে বিদ্যালয়গুলোয় জোড়াতালির পাঠদান নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন পরিবেশ কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
খবর জানাচ্ছে, দেশের ৫৫ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই এবং ১৮ শতাংশের বেশি পদে সহকারী শিক্ষক নেই। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২। এর মধ্যে ৩৮৩টি বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ২৪৯টি পদও শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য। এতে একদিকে যেমন বিদ্যালয়গুলো নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেক বিষয়েই শিখন-ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা যে শুধু শিক্ষকসংকটেই ভুগছে এমনটা নয়, জনবলসংকটে শিক্ষা প্রশাসনেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নেতৃত্বের সংকটও প্রকট। মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালকের ১০টি পদই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ৬৪টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে ২৩টি শূন্য। বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সবকটিই খালি। প্রশ্ন হচ্ছে, মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোয় যদি এমন শূন্যতা থাকে, তাহলে এই স্তরের শিক্ষার তদারকি ও পরিচালনা কীভাবে হবে?
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, শিক্ষার প্রতিটি স্তরে যে অবহেলা ও দীনতা চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ওপর। শিক্ষার্থীরা বড় ধরণের শিখন-ঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উঠছে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযোগী মানবসম্পদ হয়ে উঠতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দিতেই হবে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে সুস্পষ্টভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, বিদ্যালয়ে প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকতে হবে। বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে প্রতি ৩৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। তবে বিদ্যালয়ভেদে পরিস্থিতি যে সঙিন, সেটা প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ঢাকা ও নেত্রকোনার দু’টি বিদ্যালয় তার দৃষ্টান্ত।
মাধ্যমিক শিক্ষা মূলত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক না থাকার অর্থ হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হওয়া। আবার একজন শিক্ষককে তিন-চারটি ক্লাসের জায়গায় দিনে ছয়-সাতটি ক্লাস নিতে হচ্ছে। ফলে তাদের দিক থেকেও কার্যকর পাঠদানের ক্ষেত্রে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জন দুর্বল হয়ে পড়ছে, শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান ও সুযোগ-সুবিধা বলেই ধরে নেওয়া হয়। শিক্ষক-ঘাটতিতে এখানকার পাঠদান যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বেশির ভাগ বিদ্যালয়ের কী হাল, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারকে অবশ্যই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ