খুলনা | সোমবার | ১৩ জুলাই ২০২৬ | ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসা

সুস্থ হয়ে সুন্দরবনে ফিরলো ফাঁদে আহত সেই বাঘিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৩৯ এ.এম | ১৩ জুলাই ২০২৬


শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধার হওয়া সেই বাঘিনী দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবারও তার প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবনে ফিরে গেছে। রোববার দুপুর ১টা ৫ মিনিটে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের সংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম উপস্থিত থেকে বাঘিনীটি অবমুক্ত করেন।
বাঘ অবমুক্ত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই বাঘ বনের প্রাণী তাকে বনেই মানাবে। সে সুন্দরবনে ফিরে গেছে। আমরা আমাদের বন বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞ যে, তারা গত ছয় মাস আগে বাঘের পায়ে যে ইনজুর হয়েছিল তা সুস্থ করতে পেরেছে। আপনারা অবগত আছেন যে হরিণ শিকারের জালে বাঘটি আটকা পড়ে। তখন ওখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাঘটি অনেক বেশি লাফালাফি করছে যার জন্য তার চামড়াসহ অন্যান্য কিছু শরীর ছিড়ে গেয়েছিল। অনেক ধরনের ট্রিটমেন্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গত ছয় মাস তাকে অবজার্ভে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে আমাদের এক্সপার্ট টিম যারা আছেন তারা আবার পরীক্ষা করছেন যে বাঘটিকে সুন্দরবনে ফিরিয়ে দিলে সে আবার শিকার করতে পারবে কিনা। তার সেই সক্ষমতা আছে, তাই আজ (রোববার) বাঘটিকে অবমুক্ত করা হলো।
বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করণের এই বিশেষ মুহূর্তে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরী, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল এবং বাঘটির চিকিৎসায় গঠিত বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিমের প্রধান ভেটেরিনারি সার্জন ড. আনিসুর রহমান।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের শরকির খালসংলগ্ন বনাঞ্চলে হরিণশিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি আহত হয়। পরদিন ৪ জানুয়ারি বন বিভাগের সদস্যরা ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে তাকে খুলনায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বাঘিনীটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে।চিকিৎসা শেষে রবিবার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, সুস্থ বাঘিনীটি এখন স্বাভাবিকভাবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচরণ করতে পারবে
বন বিভাগ জানায়, ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকার বনে শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়েছিল প্রাণীটি। পরে ট্রাংকুলাইজার, বন্দুকের মাধ্যমে অচেতন করে বাঘটি উদ্ধারের পর চিকিৎসার জন্য খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ফাঁদের রশিতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় বাঘটির সামনের বাঁ পায়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে ধরেছিল পচনও।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, শিকারিদের রশির ফাঁদে আটকে পড়ার পর টানাটানিতে বাঘটির সামনের বাঁ পায়ে তিন ইঞ্চি পরিমাণ চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সেখানে পচন ধরেছিল। পরে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের নিয়মিত চিকিৎসায় বাঘটি পুরোপুরি সুস্থ এবং ফিরেছে তার স্বাভাবিক চেহারায়। ওজন বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে ক্ষিপ্রতাও। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যায়, এখন শিকার ধরে খেতেও সক্ষম হয়েছে স্ত্রী বাঘটি (বাঘিনী)। বাঘটির বয়স ৯-১০ বছর হবে।
ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী আরও জানান, ২১ মে বাঘ গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বন বিভাগ আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে জুলাই যে কোনো সময় বাঘটিকে যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেই এলাকার বনেই অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
তিনি বলেন, বাঘটি ছাড়ার আগে তার গলায় স্যাটেলাইট রেডিও কলার পরানোর কথা ছিল। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) থেকে সরবরাহ করার কথা ছিল এই ডিভাইসটি। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে আনা সম্ভব হয়নি সেটি। যে কারণে বাঘটি দ্রæত বনে অবমুক্ত করার প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে স্যাটেলাইট রেডিও কলার পরানোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এর পরিবতর্তে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে তার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এজন্য বনের ৮ কিলোমিটার এলাকায় ২০টি সয়ংক্রিয় ক্যামের স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বাঘিনীটি বনে অবমুক্ত হওয়ার পর আগামী এক বছর তার সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে চারটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ